ইরান চুক্তি ঘিরে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নজিরবিহীন সংঘাত, চরম ঝুঁকিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি

ইরান চুক্তি ঘিরে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নজিরবিহীন সংঘাত, চরম ঝুঁকিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের মধ্যে ফাটল এবার সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর বার্তা দিয়েছেন। জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে কাতারের আমিরের পাশে বসে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, আমেরিকা বা তিনি নিজে পাশে না থাকলে ইজরায়েলের কোনো অস্তিত্বই থাকত না। অন্য কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা করতে চাননি, তিনি ইজরায়েলের জন্য তা-ই করেছেন উল্লেখ করে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি হস্তক্ষেপ না করলে বহু আগেই ইজরায়েল ধ্বংস হয়ে যেত।

এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত মূলত লেবাননে ইজরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে। ইরানের সঙ্গে আমেরিকার শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ঠিক এক ঘণ্টা আগে বেইরূটে বিমান হামলা চালায় ইজরায়েল। এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর বিচারবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। লেবাননের সমৃদ্ধ অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ট্রাম্প এই হামলাকে একটি ‘জঘন্য’ ঘটনা বলে আখ্যায়িত করেন।

সার্বভৌমত্বের দোহাই ও ইজরায়েলের অনমনীয় অবস্থান

ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারির জবাবে ইজরায়েলের পক্ষ থেকেও কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। দেশটির নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-জিভির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইজরায়েল কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির স্বার্থে নিজেদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে না এবং তারা ট্রাম্পের চুক্তি মানতে বাধ্য নয়। ইজরায়েল আমেরিকার অধীনস্থ কোনো রাষ্ট্র নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, হেজবোল্লা ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মোকাবিলা করার পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতার কথা টেনে তিনি দাবি করেন, আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করার মূল্য ইজরায়েলকে সবসময় রক্ত দিয়ে চোকাতে হয়েছে।

সংঘাতের কারণ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সম্ভাব্য প্রভাব

এই নজিরবিহীন কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মূল কারণ হলো কৌশলগত অগ্রাধিকারের ভিন্নতা। ওয়াশিংটন যখন মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফেরাতে ইরানের সঙ্গে একটি কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, তখন তেল আবিব বিষয়টিকে তাদের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছে। ইজরায়েলের আশঙ্কা, এই চুক্তির ফলে ইরান ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে।

এই বিরোধের ফলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যকার ঐতিহাসিক সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের শীতলতা তৈরি হতে পারে। ট্রাম্পের মতো কট্টর ইজরায়েল-পন্থী মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এমন হুঁশিয়ারি আসার পর, ভবিষ্যতে ইজরায়েল আমেরিকার কাছ থেকে আগের মতো একচেটিয়া সামরিক ও ভূরাজনৈতিক সমর্থন পাবে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে, এই দ্বিপাক্ষিক ফাটল মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো সামরিক উত্তেজনা বা যুদ্ধ পরিস্থিতির পথ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *