মমতার জেড প্লাস নিরাপত্তা বহাল তবিয়তেই রয়েছে, ব্যক্তিগত পিএসও নিয়ে বিশেষ ‘বায়না’ ওড়াল নবান্ন!

বুধবার রাতে কলকাতার কালীঘাটে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনের সামনে এক নজিরবিহীন নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন একটি ফেসবুক লাইভ করে দাবি করেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গেটের সামনে কোনও নিরাপত্তারক্ষী নেই এবং যে কেউ চাইলে অনায়াসে ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগ তোলা হয়, মমতার অত্যন্ত বিশ্বস্ত দুই ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী (PSO) স্বরূপ গোস্বামী ও কুসুম কুমার দ্বিবেদীকেও আচমকা সরিয়ে নিয়েছে পুলিশ। ডেরেকের এই লাইভ ভিডিও ভাইরাল হতেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র জল্পনা ছড়ায় যে, তবে কি সত্যিই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সব নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হলো? তবে রাতেই সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নবান্ন।
জেড প্লাস নিরাপত্তা অটুট, শুভেন্দুর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল পুলিশকে
নবান্নের শীর্ষ কর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা তুলে নেওয়ার যে দাবি করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নবান্নে কার্যভার গ্রহণ করার প্রথম দিনই এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে কড়া নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশিকা ছিল:
- বয়সের বিবেচনা: প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বয়স হয়েছে, তাই তাঁর যেন কোনও ধরণের শারীরিক বা যাতায়াতে অসুবিধা না হয়, তা সুনিশ্চিত করতে হবে।
- নিরাপত্তায় ত্রুটিহীনতা: জেড প্লাস (Z+) ক্যাটাগরির নিরাপত্তা পাওয়ার যোগ্য হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরক্ষায় যেন কোনও রকমের খামতি বা ত্রুটি না থাকে।
নবান্নের দাবি, শুভেন্দু অধিকারীর সেই নির্দেশ মেনেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর জেড প্লাস নিরাপত্তা অক্ষরে অক্ষরে বজায় রাখা হয়েছে এবং তাঁর বাড়ির চারপাশে পর্যাপ্ত পুলিশি প্রহরা মোতায়েন রয়েছে।
স্বরূপ-দ্বিবেদীকেই চাই! সরকারি নিয়মে ব্যক্তিগত ‘বায়না’ আসাম্ভব
তাহলে বুধবার রাতের ডামাডোলের আসল কারণ কী? নবান্ন সূত্রের দাবি, মূল সমস্যা তৈরি হয়েছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি সুনির্দিষ্ট জেদ বা ‘বায়না’ ঘিরে।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর অনড় দাবি, স্বরূপ গোস্বামী এবং কুসুম কুমার দ্বিবেদী—এই দু’জনকেই তাঁর পিএসও হিসেবে রাখতে হবে এবং অন্য কোনও পুলিশকর্মীকে তাঁর পছন্দ নয়। কিন্তু নবান্নের শীর্ষ সূত্র বলছে, সরকারি ডিউটি রোস্টার অনুযায়ী নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই অফিসারদের বদলি ও দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। সেখানে কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দের ভিত্তিতে সরকারি নিয়ম পরিবর্তন করার কোনও ব্যবস্থা প্রশাসনিক নিয়মে নেই।
এছাড়া, পুলিশ মহলের আরও একটি বড় অভিযোগ, বুধবার কলকাতায় হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে মেগা মিছিলটি করেছিলেন, সে বিষয়ে আগে থেকে প্রশাসন বা স্থানীয় পুলিশকে অফিশিয়ালি কোনও তথ্যই জানানো হয়নি। তা সত্ত্বেও খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ তড়িঘড়ি করে তাঁর যাতায়াতের পথে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল।
অতীতে শুভেন্দুর পিএসও সরানোর সেই ‘আখ্যান’ এবং নবান্নের পাল্টা যুক্তি
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অনড় দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নবান্নের প্রশাসনিক অলিন্দে এখন এক পুরোনো রাজনৈতিক ইতিহাসের চর্চা শুরু হয়েছে। তৃণমূল জমানায় শুভেন্দু অধিকারী যখন রাজ্যের প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন, তখন তাঁর স্থায়ী সঙ্গী হিসেবে অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর র্যাঙ্কের দু’জন বিশ্বস্ত ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন। পরবর্তীতে শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পেলেও, প্রথম তিন-চার মাস ওই দুই রাজ্য পুলিশের কর্মী তাঁর সঙ্গেই ছিলেন।
কিন্তু একুশের বিধানসভা ভোটের পর তৎকালীন পুলিশমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশেই শুভেন্দুর সেই দুই পুরোনো ও বিশ্বস্ত রক্ষীকে রাতারাতি সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুধু সরানোই নয়, তাঁদের একজনকে বারবার সিআইডি (CID) দফতরে ডেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা করা হয় এবং পরে দূরবর্তী জেলা पुरুলিয়ায় বদলি করে সাসপেন্ড পর্যন্ত করা হয়েছিল। অর্থাৎ, রাজ্যে বিরোধী দলনেতা হয়ে সাংবিধানিক পদ পাওয়ার পরেও শুভেন্দু অধিকারীর পুরোনো দুই পিএসও-কে তাঁর নিরাপত্তায় রাখার আবেদন তৎকালীন সরকার গ্রাহ্য করেনি।
নবান্ন সূত্রের পাল্টা দাবি, অতীতে শুভেন্দুর বেলায় যে নিয়ম খাটানো হয়েছিল, আজ মমতার বেলাতেও সরকারি নিয়ম ঠিক সেই পথেই হাঁটছে। স্বরূপ ও দ্বিবেদী ছাড়া অন্য কাউকে পিএসও হিসেবে না মানার জেদ প্রশাসনিক নিয়মে খাপ খায় না। তবে ব্যক্তিগত পিএসও বদল হলেও তাঁর সামগ্রিক ‘জেড প্লাস’ সুরক্ষাবলয়ে যে কোনও খামতি রাখা হচ্ছে না, তা অত্যন্ত জোরের সঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছে প্রশাসন।