দিনে খাবার ডেলিভারি আর রাতে খাকি উর্দির স্বপ্ন! ২৩ বছরের তরুণী খুশবুর লড়াইকে সেলাম জানাচ্ছে নেটদুনিয়া

দিনে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে গ্রাহকদের দুয়ারে খাবার পৌঁছে দেওয়া, আর রাতে যখন পুরো শহর ঘুমে মগ্ন, তখন টেবিল ল্যাম্পের আলোয় পুলিশের চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি! উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরের ২৩ বছরের তরুণী খুশবুর এই অদম্য জেদ আর হাড়ভাঙা খাটুনির গল্প এখন সমাজমাধ্যমে ভাইরাল। সচরাচর মানুষ নিজের গ্রাম বা মফস্বল ছেড়ে মুম্বইয়ের মতো মায়ানগরীতে আসেন একটু স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজে, যাতে আর কোনওদিন অভাবের দিনে গ্রামে ফিরে যেতে না হয়। কিন্তু খুশবু মুম্বই এসেছেন ঠিক উল্টো এক প্রতিজ্ঞা নিয়ে। তিনি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করতে চান ঠিকই, তবে এ শহর থেকে তিনি নিজের গ্রামে ফিরতে চান এক বুক গর্ব নিয়ে—সাধারণ পোশাকে নয়, গায়ে পুলিশের খাকি উর্দি চাপিয়ে!
বাড়ি থেকে পালিয়ে মায়ানগরীতে পা, লক্ষ্য নিজের শর্তে বাঁচা
পাঁচ ভাই-বোনের বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা খুশবু সবসময়ই নিজের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করতে চেয়েছিলেন। পরিবারের ওপর আর্থিক বোঝা না হয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই চালাতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে, বাবা-মায়ের অজান্তেই গ্রাম থেকে একাই মুম্বইগামী ট্রেনে চেপে বসেন এই লড়াকু তরুণী।
মায়ানগরীতে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজার পাশাপাশি নিজের খরচ চালানো এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির বই কেনার টাকা জোগাড় করতে তিনি বেছে নেন ‘সুইগি’-র ডেলিভারি পার্টনারের কাজ। সারাদিন রোদ-জল মাথায় নিয়ে মুম্বইয়ের ব্যস্ত রাস্তায় বাইক ছুটিয়ে খাবার ডেলিভারি করেন খুশবু। আর রাতে বাড়ি ফিরে শুরু হয় তাঁর আসল গন্তব্যের লড়াই, যার লক্ষ্য হলো উত্তরপ্রদেশ (UP) পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষায় সফল হওয়া।
সুইগি সিইও-র চোখে খুশবুর অনুপ্রেরণার রূপকথা
খুশবুর এই অবিশ্বাস্য জীবনযুদ্ধ ও সততার গল্পটি প্রথমবার সবার সামনে নিয়ে এসেছেন খোদ সুইগি ফুড মার্কেটপ্লেসের সিইও (CEO) রোহিত কাপুর। তাঁর ‘চায়ের আড্ডা’ (Chai Biskoot) নামক একটি বিশেষ ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি খুশবুর মুখোমুখি হয়েছিলেন। এই তরুণীর অপরিসীম ধৈর্য ও জীবনের প্রতি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি দেখে আবেগঘন হয়ে রোহিত কাপুর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট শেয়ার করেন।
সেখানে তিনি লিখেছেন, “ভারতের গ্রামগুলো বছরের পর বছর ধরে শুধু মানুষদের চলে যেতেই দেখেছে। খুশবুও চলে এসেছিল। ২৩ বছর বয়সে গাজিপুর থেকে মুম্বই। দিনে খাবার ডেলিভারি করে, রাতে পড়াশোনা করে। কিন্তু একটা কথা আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে গেছে। বেশির ভাগ মানুষ মুম্বই আসে যাতে আর ফিরে যেতে না হয়, খুশবু এসেছে যাতে সে একদিন সগর্বে নিজের গ্রামে ফিরতে পারে, পুলিশের ইউনিফর্ম পরে, নিজের গ্রামের মানুষের জন্য। ঘর ছাড়ার সাহস অনেকেরই থাকে, কিন্তু কেন ঘর ছাড়ছি—সেই লক্ষ্যটা এত পরিষ্কার রাখা সত্যিই বিরল।”
লক্ষ্য যখন স্থির, জয় তখন নিশ্চিত
খুশবুর এখন একটাই ধ্যান-জ্ঞান, যেভাবেই হোক কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষা পাস করে পুলিশের চাকরিটি পাওয়া। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তিনি যেমন একদিকে প্রমাণ করতে চান যে মেয়েরাও সব পারে, তেমনই অন্য দিকে নিজের গ্রামে ফিরে বাবা-মা আর গোটা এলাকার মানুষের মুখ উজ্জ্বল করতে চান। নেটদুনিয়ায় এই অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনি ছড়িয়ে পড়তেই লাখ লাখ মানুষ খুশবুর এই হার-না-মানা লড়াইকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন। সকলেরই এক বক্তব্য, জীবনে সফল হওয়ার জন্য কোনও অজুহাত বা পারিবারিক আর্থিক অনটন বাধা হতে পারে না, যদি মনের মধ্যে খুশবুর মতো এমন খাঁটি জেদ আর সততা থাকে।