আদালতের নির্দেশে স্বস্তিতে হকাররা, রেলের বুলডোজার অভিযানে সাময়িক লাগাম

কলকাতা হাই কোর্টের বড় নির্দেশে স্বস্তি পেলেন বালিগঞ্জ, বারুইপুর, যাদবপুর, বনগাঁসহ রাজ্যের একাধিক রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকার হাজার হাজার হকার। আপাতত জুন মাস পর্যন্ত রেলের জমিতে কোনো নতুন উচ্ছেদ অভিযান চালানো যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে বৈধ হকারদের উচ্ছেদের আগে বিকল্প জায়গার বিষয়টি রেল কর্তৃপক্ষকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উচ্ছেদ স্থগিতের নির্দেশ ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
রেলের জমিতে জবরদখল উচ্ছেদ সংক্রান্ত ২৫টি মামলার শুনানিতে বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্য এই অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, রেলস্টেশন সংলগ্ন যেসব জমি থেকে হকারদের সরানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে সেই জমি আদৌ রেলের কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তাই তড়িঘড়ি উচ্ছেদ না করে রেলকে প্রথমে সরেজমিনে ‘ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন’ বা বাস্তব পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে আদালতে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। এছাড়া, অতীতে যাদের রেলের তরফে বসার অনুমতি বা লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, তাদের ক্ষেত্রে বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কী করা যায়, তাও রেলকে জানাতে হবে।
মৌলিক অধিকার ও আইনি বিতর্ক
মামলাকারী পক্ষের আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য আদালতে সওয়াল করেন যে, যেভাবে হঠাৎ বুলডোজার পাঠিয়ে হকারদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার ও কর্মসংস্থানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। দশক ধরে ঠেলাগাড়ি বা ঝুপড়ি দোকান চালিয়ে সংসার চালানো এই দুর্বল শ্রেণির পাশে রাজ্য ও কেন্দ্র—উভয় সরকারেরই দাঁড়ানো উচিত। অন্যদিকে, আইনজীবী ফিরদৌস শামিম অভিযোগ তোলেন, বারুইপুর বা ডানকুনির মতো বহু এলাকায় বৈধ লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও পরিবারগুলোকে খামখেয়ালিভাবে উচ্ছেদের নোটিস দেওয়া হয়েছে। যদিও রেলের আইনজীবী ধীরজ ত্রিবেদী দাবি করেন, বহু ক্ষেত্রে জমির ন্যূনতম অর্থ জমা না দেওয়ায় এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিচারপতিও প্রশ্ন তোলেন, রেলের প্ল্যাটফর্ম বা যাতায়াতের রাস্তা দখল হলে রেল কেন ব্যবস্থা নেবে না? তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদালত আপাতত জুন মাস পর্যন্ত উচ্ছেদে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
উচ্ছেদের কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
রেলযাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধা ও স্টেশন চত্বর পরিষ্কার রাখার যুক্তি দেখিয়ে রেল এই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছিল। তবে বিকল্প পুনর্বাসন ছাড়া এই আকস্মিক অভিযানের ফলে হাজার হাজার পরিবার রাতারাতি কর্মহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, যার ফলে তৈরি হয়েছে তীব্র সামাজিক অসন্তোষ। আদালতের এই সাময়িক স্থগিতাদেশের ফলে হকাররা যেমন কিছুটা সময় পেলেন, তেমনই রেলের জন্য এখন আইনি নথিপত্র ও জমির মালিকানা প্রমাণ করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়াল।