‘১২ হাত রাজ্যের ১৩ হাত ধার’! দেউলিয়া রাজকোষ বাঁচাতে কড়া দাওয়াইয়ের পথে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত?

কলকাতা: প্রবাদে আছে, ‘১২ হাত কাঁকুড়ের ১৩ হাত বিচি’। আর বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রাজকোষের দিকে তাকালে এখন বলতে হয়— ‘১২ হাত রাজ্যের ১৩ হাত ধার’! বিগত তৃণমূল সরকারের পেশ করা অন্তর্বর্তী বাজেট অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ আর্থিক বছর শেষে রাজ্যের মোট পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ দাঁড়াতে চলেছে প্রায় ৮.১৫ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল ঋণের মহাসমুদ্র থেকে রাজ্যকে কীভাবে টেনে তুলবেন নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত? সোমবার, ২২ জুন বিধানসভায় তাঁর পেশ করা প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটের দিকেই এখন সবার নজর।
ভয়ংকর খাদের কিনারায় বাংলার অর্থনীতি:
- মাথাপিছু ঋণ: বর্তমানে রাজ্যের প্রতিটি নাগরিকের মাথায় গড়ে প্রায় ৭০,৬৫৩ টাকার ঋণের বোঝা চেপে রয়েছে।
- ঋণের পাহাড়: ২০১১ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতা ছাড়ার সময় রাজ্যের ধার ছিল ১.৯২ লক্ষ কোটি টাকা। মাত্র ১৫ বছরে তা বেড়ে প্রায় চার গুণ হয়েছে।
- সুদের ফাঁদ: রাজ্য সরকারের মোট আয়ের প্রায় ২০ থেকে ২৮ শতাংশই চলে যায় পুরনো ধারের সুদ মেটাতে। নীতি আয়োগের ‘ফিসকাল হেলথ ইনডেক্স ২০২৫’ অনুযায়ী, এই বিপুল সুদ গুনতে গিয়ে রাস্তাঘাট, হাসপাতাল বা স্কুল গড়ার মতো উন্নয়নের কাজে হাত একেবারে খালি হয়ে যাচ্ছে নবান্নের। দেশের ১৮টি বড় রাজ্যের মধ্যে বাংলার স্থান এখন ১৬ নম্বরে!
সঙ্কটের মূল কারণ কী? পূর্বতন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় রাজ্যের নিজস্ব কর রাজস্বের (লক্ষ্যমাত্রা ১.১৮ লক্ষ কোটি টাকা) তুলনায় ভাতা ও সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পে ব্যয় (প্রায় ১.৮ লক্ষ কোটি টাকা) ছিল অনেক বেশি। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় নতুন করে ধার করা ছাড়া পরিকাঠামো উন্নয়নের কোনও উপায় ছিল না। শুভেন্দু অধিকারীর নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই বছরেই ঋণ ও সুদ বাবদ প্রায় ৯৮,০০০ কোটি টাকার দায় মেটানো।
বাজেটে কী ‘মেকানিজম’ ঘোষণা করতে পারেন অর্থমন্ত্রী? নবান্ন সূত্রের খবর, এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি সামলাতে এবং আগামী ৫ বছরের অর্থনৈতিক রোডম্যাপ তৈরি করতে ৩টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ঘোষণা করতে পারেন স্বপন দাশগুপ্ত:
- আর্থিক শৃঙ্খলা রোডম্যাপ: ধাপে ধাপে ধার করার প্রবণতা কমিয়ে রাজকোষ ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনার একটি মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা।
- হাই-প্রোফাইল ‘ঋণ পরিচালন সেল’: বাম ও তৃণমূল জমানায় নেওয়া চড়া সুদের পুরনো ঋণগুলিকে চিহ্নিত করে, সেগুলিকে বর্তমানের কম সুদের ঋণে রূপান্তর বা পুনর্গঠন করার উদ্যোগ।
- কঠোর ব্যয়সংকোচ নীতি (Austerity Measures): অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক খরচ, উৎসব-মেলা এবং বিভিন্ন সরকারি খাতের আর্থিক অপচয় বন্ধ করতে একগুচ্ছ কড়া নির্দেশিকা।
সার্বিকভাবে দিশাহীন অর্থনীতির মঞ্চে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী সোমবার কী ‘ফিন্যান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং’ করেন, সেটাই এখন দেখার। বাংলার ঋণ আগামী দিনে ১২ হাত থেকে কমে ১১ হাত হবে, নাকি আরও বেড়ে ১৪ হাতের দিকে পা বাড়াবে, তার উত্তর মিলবে এই বাজেটেই।