বিপুল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বাংলায় পরিবর্তনের নতুন বাজেট দিতে চলেছেন স্বপন দাসগুপ্ত

বিপুল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বাংলায় পরিবর্তনের নতুন বাজেট দিতে চলেছেন স্বপন দাসগুপ্ত

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের পর রাজ্যে গঠিত শুভেন্দু অধিকারী সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট আজ সোমবার বিধানসভায় পেশ হতে চলেছে। অষ্টাদশ বিধানসভার এই প্রথম বাজেটের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্য। নতুন সরকারের পক্ষে চলতি অর্থবর্ষের বাকি আট মাসের এই বাজেট পেশ করবেন নবনিযুক্ত অর্থমন্ত্রী স্বপন দাসগুপ্ত। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর এটিই বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিল্প মহল—সবারই নজর এখন বিধানসভার দিকে। বাজেট পেশের আগে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, মানুষের বিপুল প্রত্যাশা পূরণ এবং আগামী দিনে রাজ্যের অগ্রগতির সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়াই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য।

আট লক্ষ কোটির ঋণ ও আর্থিক ভারসাম্যের কঠিন চ্যালেঞ্জ

নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো রাজ্যের ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং পূর্বতন সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল ঋণের বোঝা সামলানো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭.৮ লক্ষ কোটি টাকা, যা কার্যত ৮ লক্ষ কোটির ছুঁইছুঁই। এই বিপুল পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করতেই প্রতি বছর রাজ্যের রাজকোষ থেকে প্রায় ৮২,০০০ কোটি টাকা খরচ হয়ে যায়, যার মধ্যে শুধু সুদের দায় মেটাতেই চলে যায় ৪৯,০০০ কোটি টাকা। গত অর্থবর্ষের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের নিজস্ব রাজস্ব আদায় ছিল ১,১২,৫৪৩ কোটি টাকা, যার প্রায় ৭৫ শতাংশই ব্যয় হয়েছে ঋণ ও সুদ মেটাতে। কেন্দ্রীয় করের অংশ ও অনুদান মিলিয়ে রাজ্যের মোট আয় ২,৬০,০০০ কোটি টাকা হলেও তার এক-তৃতীয়াংশই চলে যাচ্ছে ঋণের গ্রাসে। এই তীব্র আর্থিক সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প সচল রাখা এবং পরিকাঠামো উন্নয়ন করাই নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রধান চ্যালেঞ্জ। বাজেট পেশের আগে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাসগুপ্ত কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এবং নীতি আয়োগের সহ-সভাপতি অশোক লাহিড়ীর সঙ্গে বিশেষ বৈঠকও করেছেন।

শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও নতুন নীতির হাত ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর রূপরেখা

আর্থিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে নতুন সরকার তাদের প্রথম বাজেটে শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে চলেছে বলে জানা গেছে। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণে রাজ্যে বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে শিল্পনীতিতে আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। রাজ্যের প্রায় ৯০ লক্ষ ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগের (MSME) জন্য একটি পৃথক ও আধুনিক পরিকাঠামো নীতি ঘোষণা করা হতে পারে। নতুন শিল্পনীতিতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড), জমি নীতি সংস্কার, লজিস্টিকস এবং বিশেষ প্রণোদনার ওপর জোর দেওয়া হবে। এছাড়া, শিল্প স্থাপনের প্রক্রিয়া সহজ করতে ‘ওয়ান উইন্ডো’ বা এক জানালা ব্যবস্থা এবং দ্রুত জমি সরবরাহের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। যুবসমাজকে স্বনির্ভর করতে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে প্রায় ৫ লক্ষ যুবককে স্টার্ট-আপ নীতির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সিঙ্গুরে নতুন শিল্প তালুকা গড়ে তোলা এবং পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর জন্য পৃথক আঞ্চলিক শিল্পনীতি প্রণয়নের রূপরেখাও এই বাজেটে স্থান পেতে পারে। ইতোমধ্যেই আদানি ও জিন্দাল গোষ্ঠীর মতো বড় বড় শিল্পমহল রাজ্যে গভীর সমুদ্রবন্দর ও হুগলি নদীর নিচে টানেল প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে, যা রাজ্যের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে নতুন জোয়ার আনতে পারে। পাশাপাশি, রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (DA) নিয়েও এই বাজেটে ইতিবাচক কোনো ঘোষণা আসে কি না, তা নিয়ে তীব্র জল্পনা তৈরি হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *