রোগীদের পাতে ট্যালটেলে ডালের দিন শেষ, শুভেন্দুর প্রথম বাজেটে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিপুল ভোলবদল!

দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির চিকিৎসাধীন রোগীদের পুষ্টিকর আহার নিশ্চিত করতে বড় পদক্ষেপ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সোমবার বিধানসভায় পেশ হওয়া ২০২৬ সালের প্রথম রাজ্য বাজেটে রোগীপিছু দৈনিক খাদ্যের বরাদ্দ একলাফে প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা রোগীদের খাদ্য-যন্ত্রণা দূর করতে পূর্বের ৫৬.৬৪ টাকা বরাদ্দ বাড়িয়ে এবার ১১০ টাকা করার ঐতিহাসিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মূলত সরকারি হাসপাতালগুলির খাবারের নিম্নমানের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই রোগীদের মনে ক্ষোভ ও অনুযোগ জমছিল। বরাদ্দ কম থাকায় জলের মতো ডাল-দুধ কিংবা পুষ্টিকর খাবারের বদলে স্রেফ মুড়ি-মিষ্টি দিয়ে দায় সারত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে এসএসকেএম হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনার পর এই বাস্তব সমস্যাটি উপলব্ধি করেন। পুষ্টিকর ও সুষম আহারের জন্য চিকিৎসকদের সুপারিশ মেনেই তিনি অর্থমন্ত্রীকে রোগীদের খাবারের বরাদ্দ বৃদ্ধির অনুরোধ জানান, যার ফলশ্রুতিতে এই বরাদ্দ বৃদ্ধি সম্ভব হলো।
চার জেলায় নতুন মেডিক্যাল কলেজ ও উত্তরবঙ্গে এইমস
স্বাস্থ্যক্ষেত্রের সার্বিক খোলনলচে বদলে দিতে নতুন সরকার শুধুমাত্র খাবারের বরাদ্দ বাড়িয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, বরং চিকিৎসার পরিকাঠামো বিস্তারে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করেছে। আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং, দক্ষিণ দিনাজপুর ও পশ্চিম বর্ধমান— এই চার জেলায় নতুন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ঘরের কাছে আধুনিক চিকিৎসা পাবেন এবং কলকাতার হাসপাতালগুলির ওপর চাপ অনেকটাই কমবে। এছাড়া রাজ্যের বর্তমান ১৩টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে প্রায় ৬৫০টি এমবিবিএস আসন এবং ৪৫০টিরও বেশি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট আসন বাড়ানো হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের চিকিৎসাব্যবস্থার যুগান্তকারী মানোন্নয়নে সেখানে একটি নতুন এইমস হাসপাতাল এবং একটি অত্যাধুনিক ক্যানসার হাসপাতাল স্থাপন করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এই বাজেটে।
আয়ুষ্মান ভারতের মেগা বরাদ্দ ও চিকিৎসা খাতের আধুনিকীকরণ
এবারের বাজেটে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পের জন্য রেকর্ড ৩,১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আশা ও আইসিডিএস কর্মী এবং ৭০ বছরের ঊর্ধ্বের প্রবীণ নাগরিকসহ রাজ্যের প্রায় ৭ কোটি মানুষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাবেন। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত ও বিচ্ছিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চালু হচ্ছে বিশেষ মোটরবোট অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা এবং দ্বীপভিত্তিক প্রসূতি কেন্দ্র। পাশাপাশি, হরিপাল, বামনগোলা, ফরাক্কার মতো গ্রামীণ হাসপাতালগুলির আধুনিকীকরণ ও প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ‘MRIT স্টোর’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজ্যকে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পিপিপি মডেলে পাঁচটি আঞ্চলিক মেডিক্যাল হাব তৈরি করা হবে, যেখানে শর্তানুযায়ী বেসরকারি হাসপাতালগুলির ৫০ শতাংশ শয্যা সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা বিপুল ভর্তুকিতে সংরক্ষিত থাকবে। এই সামগ্রিক বাজেট প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুণগত মান যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনই প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও নিশ্চিত হবে।