নদীর সঙ্গে ‘ছেলেখেলা’র মাশুল! আট মাসেই ফের ধূলিস্যাৎ দুধিয়া-মিরিক ব্রিজ

নদীর সঙ্গে ‘ছেলেখেলা’র মাশুল! আট মাসেই ফের ধূলিস্যাৎ দুধিয়া-মিরিক ব্রিজ

দার্জিলিং: প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মকে অগ্রাহ্য করার ফল মিলল হাতেনাতেই! ভারী বৃষ্টির প্রথম ধাক্কাতেই দার্জিলিং জেলায় বালাসন নদীর ওপর তৈরি অস্থায়ী ‘হিউম পাইপ’ ব্রিজটি সম্পূর্ণ ধূলিস্যাৎ হয়ে গেল। এই নিয়ে মাত্র আট মাসের ব্যবধানে দু’বার ভাঙল দুধিয়া-মিরিক ব্রিজ। ভূবিজ্ঞানীদের কড়া হুঁশিয়ারি, নদীর চরিত্র না বুঝে ফের একই কায়দায় ব্রিজ বানালে আগামী দিনেও পরিণতি একই হবে।

কীভাবে ঘটল এই বিপর্যয়? ১৯৬৫ সালে বালাসন নদীর ওপর তৈরি দুধিয়া-মিরিক ব্রিজটি প্রায় ৬০ বছর ধরে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামলে টিকে ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের অক্টোবরে উত্তরবঙ্গের ভয়াবহ হড়পা বানে সেটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এরপর তড়িঘড়ি সেখানে একটি অস্থায়ী ‘হিউম পাইপ’ ব্রিজ তৈরি করা হলেও, তার আয়ু হলো মাত্র আট মাস। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বালাসনের মতো একটি দ্রুতগামী পাহাড়ি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি বহনের ক্ষমতা এবং বন্যার সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই এই অপরিকল্পিত ও ত্রুটিপূর্ণ সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন? সেতুর একাধিক পিলার এবং নিচু কংক্রিটের কাঠামো নদীর প্রবাহপথকে অনেকটাই সঙ্কুচিত করে একটি ‘বটলনেক’ বা সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিল। সিধো-কানহু-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক ও ধস বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিৎ বেরা এই প্রসঙ্গে বলেন, “পুরো মহানন্দা অববাহিকাটি ফানেল-আকৃতির। ফলে পাহাড়ে বৃষ্টি হলে বিপুল জলরাশি, বড় বোল্ডার, গাছের গুঁড়ি এবং পলি প্রচণ্ড গতিতে নিচে নেমে আসে। সেতুর পিলারগুলো নদীর গতিপথ আটকে দেওয়ায় জলের চাপ বেড়ে যায় এবং পিলারের চারপাশে তীব্র ক্ষয় শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত এই বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”

কেন উত্তরবঙ্গে হড়পা বানের ঝুঁকি এত বেশি? ভূতত্ত্ববিদদের মতে, উত্তরবঙ্গের উপ-হিমালয় অঞ্চল, বিশেষত মহানন্দা ও বালাসন অববাহিকা হড়পা বানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত চারটি কারণে:

  • ফানেল-আকৃতির অববাহিকা: যার ফলে বৃষ্টির জল দ্রুত একটি সংকীর্ণ প্রবাহে কেন্দ্রীভূত হয়।
  • খাড়া পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি: যা পাহাড় থেকে নেমে আসা জলের গতিবেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
  • বনভূমি ধ্বংস: গাছপালা কমে যাওয়ায় মাটি ও পাথর আটকে রাখার প্রাকৃতিক ক্ষমতা কমছে।
  • অতি ভারী বৃষ্টিপাত: অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টির জেরে নদীর জলস্তর বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়।

পাহাড় থেকে নেমে আসা এই বিপুল জলরাশি সমতলে আসার মুখে কোনওভাবে বাধা পেলেই ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে, আর দুধিয়া-মিরিক ব্রিজের ক্ষেত্রে এই অবৈজ্ঞানিক নির্মাণের কারণেই সেই বিপর্যয় নেমে এসেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *