শাসকদলের সামনেই এক তৃণমূলের নিশানায় অন্য তৃণমূল, বিধানসভায় বেনজির রাজনৈতিক হ য ব র ল!

পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন দৃশ্যের সাক্ষী হলো রাজ্য বিধানসভা। বাজেট অধিবেশনের মঙ্গলবার শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যকার চিরাচরিত লড়াইয়ের চেনা ছক ভেঙে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে মূল সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) অভ্যন্তরীণ দুটি শিবির। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়পন্থী বিধায়করা এবং অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির—উভয় পক্ষের কাদা ছোঁড়াছুড়িতে বিধানসভার স্বাভাবিক পরিবেশ কার্যত বিশৃঙ্খল রূপ ধারণ করেছে।
একই দলের দুই শিবিরের তীব্র বাক্যবাণ
অধিবেশন চলাকালীন মমতা-পন্থী বিধায়ক কুণাল ঘোষ যখন বক্তব্য রাখতে ওঠেন, তখন তাঁর আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির। কুণাল ঘোষ বিরোধী দলনেতা ঋতব্রতকে ‘মেরুদণ্ডহীন’ এবং পিছনের দরজা থেকে আসা নেতা বলে তীব্র কটাক্ষ করেন। তিনি নারদ কাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে অভিযোগ করেন যে, ঋতব্রত শিবিরের নেতাদের বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতি ও কোটি কোটি টাকার আর্থিক তছরুপের মামলাগুলো থেকে বাঁচতেই তারা নতুন শিবির তৈরি করেছে। কুণাল ঘোষ এই শিবিরের বিরুদ্ধে সিবিআই, ইডি বা পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়া বজায় রাখার দাবি জানান এবং মুখ্যমন্ত্রীর পদক্ষেপকে পূর্ণ সমর্থন করেন। অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির দাবি করেছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক তাদের সঙ্গে রয়েছে এবং তারাই আসল তৃণমূল। এই প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে রতুয়ার তৃণমূল বিধায়ক সমর মুখোপাধ্যায়কেও শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে নিশানা করতে দেখা যায়, যা দলের অভ্যন্তরীণ ফাটলকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সংঘাতের কারণ ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব
এই নজিরবিহীন সংঘাতের মূল কারণ হলো তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও বৈধতা নিয়ে দলের ভেতরের গভীর ফাটল। বিধানসভায় সংখ্যার বিচারে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা হলেও, মমতাপন্থী বিধায়করা তা মানতে নারাজ এবং তাঁরা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে নিজেদের নেতা মনে করেন। এই দুই শিবিরের পারস্পরিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টাই বিধানসভাকে এক অদ্ভুত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
এই ঘটনার সম্ভাব্য প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বিরোধী দলের এই তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও কাদা ছোঁড়াছুড়ির ফলে শাসকদল রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যেভাবে কুণাল ঘোষের বক্তব্যের জবাবে ঋতব্রত শিবিরের বিরুদ্ধে চুরির সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ চেয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন, তা বিরোধী শিবিরের ফাটলকে আরও চওড়া করবে। এর ফলে বিধানসভায় সরকারের নীতি ও কাজের ওপর কার্যকর নজরদারি ব্যাহত হতে পারে এবং জনগণের মৌলিক ইস্যুগুলো আড়ালে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।