আমফানে ত্রাণ বণ্টন থেকে স্বাস্থ্যসাথী, একাধিক গড়মিল! বিধানসভায় পেশ ২৮টি CAG রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য

দীর্ঘ চার বছর পর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় একসঙ্গে ২৮টি কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG) রিপোর্ট পেশ করল রাজ্য সরকার। শনিবার বিধানসভায় ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের এই রিপোর্টগুলি পেশ করা হয়। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, CAG রিপোর্টগুলির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য শীঘ্রই বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকা হবে। একইসঙ্গে, এতদিন রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ না করার জন্য আগের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে ‘সাংবিধানিক গাফিলতি’র অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
আমফান ত্রাণ ও পুনর্বাসনে চরম অনিয়ম
CAG-এর রিপোর্টে ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আমফানের পর ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজ নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য চাওয়ার সময় রাজ্য সরকারের জমা দেওয়া ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ‘অতিরঞ্জিত এবং বাস্তবসম্মত নয়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পর্যাপ্ত প্রমাণও সেই হিসাবের সঙ্গে দেওয়া হয়নি।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, আমফান পরবর্তী বাড়ি পুনর্নির্মাণের জন্য ৯,২২৬ জন উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে একাধিকবার টাকা পাঠানো হয়েছিল। এর জেরে মোট ১৮.০৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত অর্থ বিতরণ করা হয়। উপভোক্তা নির্বাচনে গুরুতর ত্রুটি এবং ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT)-এর আগে টাকা পাঠানো আটকানোর মতো প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব ছিল বলেই দাবি করেছে অডিট সংস্থা।
স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পেও গড়মিল
শুধু আমফান নয়, রাজ্যের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ‘স্বাস্থ্য সাথী’ নিয়েও বেশ কিছু প্রশ্ন তুলেছে CAG। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত এই প্রকল্পে নথিভুক্ত পরিবারের সংখ্যা রাজ্যের মোট রেশন কার্ডধারী পরিবারের সংখ্যার তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি ছিল। নিয়মের বাইরে গিয়ে অযোগ্য উপভোক্তাদের কাছে প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে যাওয়ার এই সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
পুরসভা ও সর্ব শিক্ষা মিশনে বিশৃঙ্খলা
পুরসভা ও নগর স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনায় অনিয়মের চিত্রও উঠে এসেছে রিপোর্টে। ১০৯টি পুরসভায় নির্বাচন ৬ থেকে ৩২ মাস পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা কেন্দ্রীয় অর্থ কমিশনের অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি, ২৭টি পুরসভায় কোনো খসড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি হয়নি এবং ১১৯টি পুরসভায় বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি বকেয়া রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ‘সর্ব শিক্ষা মিশন’ (PBSSM) প্রকল্পেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সঠিক সমন্বয় না থাকায় প্রায় ৩৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দ অর্থ ব্যবহার না করেই ফেরত দিতে হয়েছে।
চার বছর পর একসঙ্গে এই ২৮টি অডিট রিপোর্ট প্রকাশের জেরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। আগামী দিনে বিশেষ অধিবেশনে এই রিপোর্টগুলি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে আমফান ত্রাণ, স্বাস্থ্যসাথী ও অন্যান্য প্রকল্পের অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে তরজা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।