কার্গিল বিজয় দিবস ২০২৬: ৫২৭ জন জওয়ানের রক্তে ভেজা পাহাড়ি শৃঙ্গ! কীভাবে রচিত হয়েছিল ভারতের ঐতিহাসিক জয়?

আজ ২৬ জুলাই। আসমুদ্র হিমাচলের বুক চিরে উঠে আসা গর্ব, সম্মান আর আবেগের দিন— কার্গিল বিজয় দিবস। বরফে মোড়া কার্গিলের দুর্গম ও খাড়া শৃঙ্গগুলোতে শত্রুর রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে তেরঙ্গা উড়িয়েছিলেন ভারতের বীর জওয়ানরা। ১৯৯৯ সালের সেই ঐতিহাসিক দিনটিকে আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে পুরো দেশ। তবে এই অর্জনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে গভীর বিষাদের স্মৃতিও।
মাতৃভূমির এক ইঞ্চি জমিও শত্রুর হাতে ছাড়তে নারাজ, এমন কঠোর প্রতিজ্ঞায় কার্গিলের রণাঙ্গনে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ৫২৭ জন অমর জওয়ান। তাঁদের এই বীরত্ব ও আত্মত্যাগের কথা মনে করেই আজ গর্বে ও শ্রদ্ধায় অবনত হয় প্রতিটি ভারতবাসীর মাথা।
১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর থেকেই সীমান্তজুড়ে টানটান উত্তেজনা ছিল, যা দীর্ঘ দুই দশক ধরে মূলত ছাইচাপা আগুনের মতো প্রজ্জ্বলিত ছিল। সুযোগ বুঝে পাকিস্তান মাঝেমাঝেই অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা চালাত, আর ভারতীয় সেনাদের কাছ থেকে পেত যোগ্য জবাব। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের বিচক্ষণ নীতির কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল পাকিস্তান। সীমান্তে বারবার ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ব্যাকফুটে চলে যাওয়ার হতাশা থেকেই শেষমেশ এক দুঃসাহসিক ও হঠকারী চক্রান্তের পথ বেছে নেয় পাক সেনা।
১৯৯৮-৯৯ সালের হাড়কাঁপানো শীতের রাতে ভারতীয় সেনাদের নজর এড়িয়ে গোপনে ‘লাইন অফ কন্ট্রোল’ (LoC) বা নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকতে শুরু করে পাক সেনারা। তাদের এই কাপুরুষোচিত অনুপ্রবেশের সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন বদ্রি’। কিন্তু ভারতের অতন্দ্র প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দেওয়া কি এতই সহজ? পাক চক্রান্তের খবর টের পাওয়া মাত্রই বজ্রকঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলে ভারত। শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘অপারেশন বিজয়’। কার্গিলের সীমান্ত পাহাড়ে ঘনীভূত হয় যুদ্ধের কালো মেঘ। প্রায় দুই লক্ষ বীর সেনাকে ময়দানে নামিয়ে শত্রুর বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয় ভারতীয় বাহিনী।
দু’মাসেরও বেশি সময় ধরে চলে রক্তক্ষয়ী ও রোমহর্ষক যুদ্ধ। চরম প্রতিকূল আবহাওয়া আর ভৌগোলিক অবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দাঁতে দাঁত চিপে লড়াই চালায় ভারতীয় সেনা, এবং শেষ হাসি হাসে তারাই। ১৯৯৯ সালের ২৬ জুলাই ভারতীয় জওয়ানদের অদম্য সাহস ও পরাক্রমের সামনে অবশেষে নিঃশর্ত নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় পাক বাহিনী। কার্গিলের বরফাবৃত পাহাড়ে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব।
সেই থেকে প্রতি বছর ২৬ জুলাই গোটা দেশ একসূত্রে গেঁথে যায় শহীদদের স্মরণে। রাজধানী নয়াদিল্লির জাতীয় যুদ্ধ স্মারক থেকে শুরু করে দেশের কোণায় কোণায় প্রতিটি ভারতবাসী স্যালুট জানায় সেইসব বীর নায়কদের, যাঁদের রক্তে ও সাহসিকতায় আজও সুরক্ষিত রয়েছে আমাদের দেশের সীমান্ত।