কোভিডের অক্সিজেন পরিকাঠামো ও তহবিল তছরুপ: ক্যাগ রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য, তদন্তের নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর!

করোনা অতিমারীর ভয়াবহ সময়ে জরুরি ভিত্তিতে তৈরি করা অক্সিজেন পরিকাঠামো, ভেন্টিলেটর ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের বড় অংশই কার্যত অকেজো বা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। শুধু তাই নয়, কোভিড মোকাবিলার জন্য বরাদ্দ বিপুল অঙ্কের অন্তত ৬৫ শতাংশ অর্থও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খরচ করা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গে কোভিড পরিকাঠামো তৈরির অগ্রগতি ও সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে এমনই একাধিক প্রশ্ন তুলেছে ভারতের কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (ক্যাগ)-এর সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্ট। এ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
গত শুক্রবার বিধানসভায় পেশ হয়েছে ক্যাগ রিপোর্ট। তাতে উম্পুনের সময়ে তৎকালীন রাজ্য সরকারের ত্রাণ বিলিতে বিপুল আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর, এ বার ২০২৪–এর সেই ক্যাগ রিপোর্টে আরও দেখা গিয়েছে, ‘পিএম কেয়ার্স’ তহবিল এবং কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) প্রকল্পের অর্থে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে যে পিএসএ বা ‘প্রেশার সুইং অ্যাডসর্পশন’ অক্সিজেন উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল, তার ৫৭ শতাংশই অডিটের সময় পর্যন্ত হয় অকেজো অথবা তখনও চালু হয়নি। মোট ৭৫টি অক্সিজেন প্লান্টের মধ্যে মাত্র ৩২টি ২০২৩–এর ডিসেম্বর পর্যন্ত চালু ছিল। বাকি ৪৩টি প্লান্টের কী হল, কেন চালু করা হলো না, সেই বিষয়ে কিছুই জানা যায়নি।
অর্থাৎ, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তৈরি হওয়া পরিকাঠামোর উল্লেখযোগ্য অংশই দীর্ঘদিন রোগী পরিষেবার বাইরে থেকেছে। ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য সঙ্কট তৈরি হলে এই পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলেই ইঙ্গিত মিলেছে ক্যাগ রিপোর্টে। শুধু অক্সিজেন প্লান্ট নয়, চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একাধিক অসঙ্গতির উল্লেখ করেছে ক্যাগ। রিপোর্ট অনুযায়ী, অন্তত দু’টি সরকারি হাসপাতালে কেন্দ্রীয় সরকারের পাঠানো ভেন্টিলেটর এবং অক্সিজেন কনসেনট্রেটর দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। কোথাও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাব, কোথাও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি, আবার কোথাও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ওই যন্ত্রগুলি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহারই করা যায়নি। ফলে জরুরি প্রয়োজনে কেনা অত্যাধুনিক সরঞ্জামের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
অডিট রিপোর্টে কোভিড তহবিলের ব্যবহার নিয়েও কড়া পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২২–এর মার্চ পর্যন্ত কোভিড মোকাবিলার জন্য বরাদ্দ বিপুল অঙ্কের অর্থ অব্যবহৃত থেকে যায়। অর্থাৎ, স্বাস্থ্য পরিষেবা আরও শক্তিশালী করা, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলা কিংবা চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেই অর্থের পুরোটা কাজে লাগানো হয়নি। বস্তুত, মাত্র ৩৫ শতাংশ অর্থই কাজে লাগানো হয়েছিল। কী কারণে এই অর্থ খরচ করা যায়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অডিট সংস্থা।
প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট দেখা গিয়েছে। কোথাও প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি, কোথাও আবার পরিকাঠামো তৈরি হলেও তা চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছিল না। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয় করেও তার প্রত্যাশিত সুফল মেলেনি বলে পর্যবেক্ষণ ক্যাগের। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পেশ হওয়া এই অডিট রিপোর্টে ২০২০-’২১ থেকে ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যকলাপ পর্যালোচনা করা হয়েছে। তার মধ্যে কোভিড মোকাবিলায় গড়ে তোলা স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারের এই পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রশাসনিক মহলের একাংশ।
সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্তাদের একাংশের মতে, অতিমারীর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতির জন্য শুধু পরিকাঠামো তৈরি করাই নয়, তার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ লোকবল নিয়োগ এবং বরাদ্দ অর্থের সময়মতো ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাগ রিপোর্টের এই অনিয়ম প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে প্রাক্তন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য অবশ্য জানান যে তিনি রিপোর্টটি দেখেননি, তাই না দেখে কিছু বলতে পারবেন না।
তবে নতুন বিজেপি সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, “তৃণমূল সরকারের আমলে সব ক্ষেত্রেই টাকা নয়ছয় হয়েছে। বিভিন্ন খাতের টাকা এদিক–অদিক করেছে ওরা। স্বাস্থ্য ক্ষেত্র বা কোভিড চিকিৎসা পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আপাতত আমরা সেবাশ্রয় নিয়ে তদন্তে ব্যস্ত আছি। সেটা শেষ হলেই অথবা সমান্তরাল ভাবে কোভিড ফান্ডের নয়ছয় নিয়েও তদন্ত শুরু করবে স্বাস্থ্য দপ্তর।”