“ওরা কি উগ্রপন্থী?” শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমাতে মারণ অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনায় তোলপাড় জাতীয় রাজনীতি

বর্তমানের উত্তপ্ত জাতীয় রাজনীতি এখন আবর্তিত হচ্ছে একটি AK-47 স্বয়ংক্রিয় রাইফেলকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি NEET প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে গত ২৫ জুলাই বিহারের সিওয়ানে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন একদল পড়ুয়া। কিন্তু সেই সময় আন্দোলনকারীদের ঠিক সামনে ওই মারণ অস্ত্র তাক করে গুলি চালানোর একটি ভয়াবহ ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই গোটা দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তরজা।
এই নৃশংস ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে অবিলম্বে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব।
“ওরা কি উগ্রপন্থী?” তোপ রাহুল-প্রিয়াঙ্কার
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম X-এ একটি জোরালো পোস্টে কেন্দ্র সরকারকে তীব্র আক্রমণ করে রাহুল গান্ধী লেখেন, দেশের গোটা সিস্টেম আজ নীতিগতভাবে পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে নেমে পড়েছে। খবর আসছে, প্রতিবাদী বিহারের শতাধিক ছাত্রছাত্রীকে বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁদের নামে একাধিক মিথ্যা এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি কটাক্ষ করে রাহুল বলেন, “মোদীজি, আপনি তো বড় বড় কথা বলেছিলেন যে পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে কোনো এফআইআর হবে না, সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হবে! তাহলে পরিবর্তে আজ তাদের উপর এইভাবে নৃশংসভাবে মারণ অস্ত্র তাক করা হচ্ছে কেন? কোথায় গেল আপনার সেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি?” পশ্চিমবঙ্গ হোক, বিহার কিংবা খোদ দিল্লি—দেশের সর্বত্র সরকারের এই দমনপীড়নের ধরন ও চরিত্র যে একই, তা তীব্র ভাষায় তোপ দেগেছেন তিনি।
শুধু রাহুল গান্ধীই নন, কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও এই অমানবিক ঘটনার প্রতিবাদে অত্যন্ত জোরালোভাবে সোচ্চার হয়েছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দেশের এই পড়ুয়ারা কোনো অপরাধী বা সন্ত্রাসী নয়। আমরা আশ্চর্যজনকভাবে শুনছি, প্রতিবাদে অংশ নেওয়া এক ছাত্রীর বাবা-মাকে পর্যন্ত ফোন করে ভয় দেখানো হচ্ছে এবং কৈফিয়ত চাওয়া হচ্ছে—কেন তাঁদের মেয়ে আন্দোলনে যোগ দিয়েছে? দেশের মেয়েদের কি গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ করার বিন্দুমাত্র অধিকার নেই?”
বিরোধীদের নিশানা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে
অন্যদিকে, সংসদ চত্বর থেকে এই ঘটনায় সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কেসি বেণুগোপাল। তাঁর সরাসরি ও কড়া প্রশ্ন, “অমিত শাহ ঠিক কী লুকাতে চাইছেন? আন্দোলনরত নিরস্ত্র পড়ুয়াদের উপর পেলেট গান ও AK-47-এর মতো মারণ অস্ত্র ব্যবহার করার নির্দেশ ঠিক কে দিয়েছেন, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে।” শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে এ ধরনের প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা কতটা আইনসম্মত ও যুক্তিযুক্ত, সেই প্রশ্নও তুলেছেন বর্ষীয়ান কংগ্রেস সাংসদ মনীশ তিওয়ারিও।
সুপ্রিম কোর্টের কড়া বার্তা ও পুলিশের পদক্ষেপ
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিওটি ঝড়ের গতিতে ভাইরাল হতেই নড়েচড়ে বসে বিহার প্রশাসন। ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কনস্টেবলকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। সিওয়ানের এসপি পূরণ কুমার ঝা সংবাদমাধ্যমকে জানান, গুলি চালানোর ওই অনভিপ্রেত ঘটনায় সৌভাগ্যবশত কেউ হতাহত হননি এবং পুরো ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রতিবাদ মিছিলে যাতে কোনোভাবেই আগ্নেয়াস্ত্র বা ফায়ার করা না হয়, সে বিষয়ে পুলিশকর্মীদের প্রতি কঠোর নির্দেশ জারি করা ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে, আন্দোলনের নামে পুলিশের এই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। দেশের শীর্ষ আদালত সাফ জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কোনোভাবেই অতিরিক্ত বল প্রয়োগ বা সরাসরি গুলি চালানো যায় না। পুলিশের তরফ থেকে প্রথমে বারবার সতর্ক করতে হবে, প্রয়োজন হলে জলকামান, হালকা লাঠিচার্জ বা কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে চরম ও অনিবার্য পরিস্থিতি ছাড়া এবং ম্যাজিস্ট্রেটের লিখিত অনুমতি ছাড়া এভাবে ফায়ারিংয়ের নির্দেশ দেওয়া কোনোভাবেই আইনসম্মত নয়। NEET বিক্ষোভের এই বিস্ফোরক আবহে বিরোধীদের সম্মিলিত আক্রমণ এবং সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া বার্তা গোটা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।