‘এখন না হলে কখনও নয়’, JPSC-JSSC স্ক্যামের প্রতিবাদে রাঁচিতে মরণপণ লড়াইয়ে তরুণ ছাত্রনেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো

নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) আন্দোলন এবং সোনম ওয়াংচুকের ঐতিহাসিক আমরণ অনশন সম্প্রতি কেঁপে দিয়েছিল দিল্লির দরবার। কেন্দ্রকে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করেছিল সেই অহিংস লড়াই। ঠিক একইরকম এক প্রতিবাদের সাক্ষী হচ্ছে প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ড। ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (JPSC) ও স্টাফ সিলেকশন কমিশন (JSSC)-এর নিয়োগ পরীক্ষায় ভূরি ভূরি অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে সরব হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী। আর এই আন্দোলনের মধ্যমণি হয়ে উঠেছেন তরুণ ছাত্রনেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো।
সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে দিন-রাত এক করে অবস্থান চালাচ্ছেন চাকরিপ্রার্থীরা। বারবার কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বাস্তব কোনো পদক্ষপ না দেখায়, শেষ পর্যন্ত আমরণ অনশনের কঠিন পথ বেছে নিয়েছেন দেবেন্দ্রনাথ। গত রবিবার রাত থেকে শুরু হওয়া এই অনশন প্রসঙ্গে তিনি জানান, “লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চিত। তাই অধিকার আদায়ের এই লড়াই আমাদের কাছে ‘এখন না হলে কখনও নয়’-এর মতো মরণপণ সংগ্রাম।”
আন্দোলনের পেছনের প্রেক্ষাপট: গত ৫ জুলাই ১৪তম JPSC সিভিল সার্ভিস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই অসঙ্গতি ও কারচুপির অভিযোগে ক্ষোভে ফেটে পড়েন পরীক্ষার্থীরা। ধারাবাহিকভাবে নানা প্রতিবাদের পর ২৫ জুলাই থেকে শুরু হয় দিন-রাতের সত্যগ্রহ এবং ২৯ জুলাই থেকে জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান বিক্ষোভ শুরু হয়।
আন্দোলনকারীদের প্রধান ৩টি দাবি: ১. কেন্দ্রীয় তদন্ত: ১৪তম JPSC এবং JSSC CGL সহ সমস্ত বিতর্কিত পরীক্ষার অনিয়মের তদন্তভার সিবিআই (CBI) ও ইডি (ED)-র হাতে তুলে দিতে হবে।
২. পরীক্ষা বাতিল: নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা না আসা পর্যন্ত ১৪তম JPSC প্রিলিমিনারি পরীক্ষা বাতিল রাখতে হবে।
৩. ব্যবস্থার সংস্কার: সম্পূর্ণ দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে যোগ্য প্রার্থীদের দ্রুত সুবিচার দিতে হবে।
অনশনের দ্বিতীয় দিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বার্তায় দেবেন্দ্রনাথ জানান, শরীরে ক্লান্তি এলেও রাজ্যের শিক্ষার্থীদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সংকল্প আরও দৃঢ় হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের প্রতি তাঁর আকুল আবেদন—লড়াই যেন কোনোভাবেই অহিংসা ও সংবিধানের পথ থেকে বিচ্যুত না হয়।
কে এই দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো? রাঁচির গ্রামীণ পটভূমির সন্তান দেবেন্দ্রনাথ মেধার দিক থেকে অত্যন্ত উজ্জ্বল। সংস্কৃতি ও কুরমালি/উপজাতীয় ভাষায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি বি.এড সম্পন্ন করেন। ২০২৪ সালের ঝাড়খণ্ড বিধানসভা নির্বাচনে তামার আসন থেকে নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়াইও করেছিলেন। ২০১৫ সাল থেকে স্কলারশিপ, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই করছেন তিনি। আন্দোলন চলাকালেই তিনি মাতৃহারা হন, তবু থামেনি তাঁর প্রতিবাদের কণ্ঠ।
দেশজুড়ে সমর্থনের হাওয়া ও ‘ওয়াংচুক ২.০’: ঝাড়খণ্ডের এই ছাত্র আন্দোলন এখন আর রাজ্যের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। সোনম ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলনের সহযোগী ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেবেন্দ্রনাথের আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছেন। রাজধানী দিল্লিতে ওয়াংচুকের দীর্ঘ অনশন যেমন সত্যগ্রহের শক্তিপ্রমাণ করেছিল, রাঁচির রাজপথে দেবেন্দ্রনাথের অনশনকেও এখন অনেকে ‘ওয়াংচুক ২.০’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
আপাতত রাঁচির স্টেডিয়ামে অনড় চাকরিপ্রার্থীরা। তাঁদের স্পষ্ট বার্তা—দুর্নীতি মুক্ত নিয়োগ ব্যবস্থা ও নিরপেক্ষ তদন্তের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত থামবে না এই আন্দোলন।