মাছ-মোষ বিক্রি থেকে ভিটেমাটি হারানো—সব ট্র্যাজেডিকে হার মানিয়ে জাতীয় ক্যারাটেতে সোনা আসামের জানমনির!

গলায় জ্বলজ্বল করছে জাতীয় মঞ্চে জেতা সোনার পদক, অথচ সেই সাফল্য উদযাপনের জন্য মাথার ওপর নিজের ছাদটুকুও নেই! ভয়াবহ বন্যায় ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ায় এখন নদীর বাঁধে ত্রিপল টাঙিয়ে রাত কাটছে পরিবারটির। অভাবনীয় এই লড়াই ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখেছেন আসামের জোরহাট জেলার ১৭ বছরের তরুণী জানমনি কোঁয়ার।
মাছ ও মোষ বিক্রির টাকায় স্বপ্নের উড়ান
সম্প্রতি দিল্লির তালকোটরা ইন্ডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত জাতীয় ক্যারাটে চ্যাম্পিয়নশিপের আশিহারা বিভাগে সোনা জিতে ইতিহাস গড়েছে জানমনি। তবে এই পথ চলাটা একেবারেই সহজ ছিল না।
গত ১৯ জুলাই গ্রাম লাগোয়া বাঁধ ভেঙে এক লহমায় ভেসে যায় তাদের বাড়িঘর। জলের তোড়ে ভেসে যায় পরিবারের আয়ের একমাত্র সম্বল মাছের ভেড়ি ও হাঁস-মুরগি। এর আগেও মেয়ের ক্যারাটে শেখার খরচ জোগাতে দুটি মোষ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল পরিবারটি। জানমনির দাদা কৃষ্ণমণি জানান, মাছ বিক্রির টাকায় মেয়ের দিল্লি যাওয়ার খরচ তোলার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু বন্যা এসে সব শেষ করে দেয়।
ত্রিপলের নিচে চলত কঠোর অনুশীলন
মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকে ক্যারাটে শিখছে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী জানমনি। ২০২৩ সালে ব্রোঞ্জ এবং ২০২৫ সালে সোনা জয়ের পর এবারও জাতীয় আসরের জন্য কঠোর পরিশ্রম করছিল সে। ঠিক তখনই আঘাত হানে বন্যা। কিন্তু ঘরবাড়ি হারিয়ে বাঁধের ওপর আশ্রয়ে থেকেও দমে যায়নি জানমনি। কষ্ট বুকে চেপে ত্রাণের সেই অস্থায়ী আস্তানাতেই ক্যারাটের নিখুঁত মহড়া চালিয়ে গেছে সে।
ত্রাতার ভূমিকায় ‘ফিজিক্সওয়ালা’
বাড়ি ভেসে যাওয়া এবং বন্যা পরিস্থিতিতে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দিল্লি পৌঁছানোই একসময় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে জানমনির পাশে দাঁড়ান জনপ্রিয় এডটেক প্ল্যাটফর্ম ‘ফিজিক্সওয়ালা’-র প্রতিষ্ঠাতা অলখ পাণ্ডে। আসামের বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শনে এসে জানমণির লড়াইয়ের কথা জানতে পেরে তিনি নিজেই তার দিল্লি যাওয়া-আসা ও থাকার যাবতীয় খরচ বহন করেন। পাশাপাশি, জানমণির পরিবারকে ৩ লক্ষ টাকার আর্থিক সাহায্যও দেন তিনি। এছাড়া বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্ঘেরিটা তরুণীকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে সাহায্য করেন।
সোনা জিতে ফের সেই বাঁধের আস্তানায়
জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতে ডিব্রুগড় বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর জানমনি ফিরে আসে বন্যাকবলিত গ্রামের সেই বাঁধের ওপরের অস্থায়ী ঠিকানাতেই। যা পরিস্থিতি, তাতে আগামী নভেম্বরের আগে নিজেদের ঘরে ফেরা সম্ভব নয়।
তবে এই সোনা জয়েই থেমে থাকতে রাজি নয় জানমনি। তার স্বপ্ন আন্তর্জাতিক স্তরে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা। চরম অভাব, দারিদ্র্য আর বন্যার ধ্বংসলীলাকে জয় করে জানমনির এই সাফল্য এখন গোটা পরিবারের কাছে একচিলতে আশার আলো।