ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন আশা: ট্রায়ালে বাজিমাত মডার্নার ‘স্মার্ট’ ভ্যাকসিনের, ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের দোরগোড়ায় আধুনিক প্রযুক্তি

ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন আশা: ট্রায়ালে বাজিমাত মডার্নার ‘স্মার্ট’ ভ্যাকসিনের, ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের দোরগোড়ায় আধুনিক প্রযুক্তি

ক্যান্সার চিকিৎসায় এক ঐতিহাসিক সাফল্যের সামনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান। ত্বক বা স্কিন ক্যান্সারের অত্যন্ত মারাত্মক ধরন ‘মেলানোমা’ (Melanoma)-র ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর রোগটি পুনরায় ফিরে আসা এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়া (Metastasis) ঠেকাতে মডার্না (Moderna) ও মার্ক (Merck)-এর যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি ব্যক্তিগতকৃত (Personalized) mRNA ক্যান্সার ভ্যাকসিন ও ‘কিট্রুডা’ (Keytruda) ইমিউনোথেরাপির ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অবিশ্বাস্য সাফল্য মিলেছে।

সাধারণ ভ্যাকসিন নয়, এটি কীভাবে কাজ করে?

এই ভ্যাকসিনটি সাধারণ প্রতিষেধকের মতো সংক্রমণ রোখে না। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগীর টিউমারটি কেটে বের করার পর সেটির জিনগত পরিবর্তন (Mutation) বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর সম্পূর্ণ ব্যক্তিনির্ভর বা Personalised উপায়ে রোগীর শরীরের টিউমার কোষের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এই mRNA ভ্যাকসিনটি প্রস্তুত করা হয়। এটি মানবদেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে (Immune System) এমনভাবে শিক্ষিত করে তোলে, যাতে তা ভবিষ্যতে লুকিয়ে থাকা অবশিষ্টাংশ বা নতুন ক্যান্সার কোষগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করে ধ্বংস করে দিতে পারে।

১,১৩৭ জন রোগীর ওপর সফল পরীক্ষা

তৃতীয় পর্যায়ের (Phase 3) এই বিশাল ট্রায়ালে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ Stage IIB থেকে Stage IV মেলানোমায় আক্রান্ত ১,১৩৭ জন রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রোগীদের দুটি দলে ভাগ করে একদলকে শুধু কিট্রুডা এবং অন্যদলকে কিট্রুডার পাশাপাশি মডার্নার এই বিশেষ ভ্যাকসিনটি দেওয়া হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, যারা যৌথ চিকিৎসা পেয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ক্যান্সার ফিরে আসা এবং দূরবর্তী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া ওষুধটির বিশেষ কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা যায়নি।

কেন এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ?

মেলানোমা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এক ধরণের স্কিন ক্যান্সার। সার্জারি করার পরেও অনেক সময় রোগীদের শরীরে এই রোগ ফিরে আসে। কিট্রুডার মতো বিশ্বস্ত ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে নিজস্ব টিউমার অনুযায়ী তৈরি ভ্যাকসিনের সংমিশ্রণ চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ বছরের তথ্যেও দেখা গেছে, এই যৌথ চিকিৎসায় ক্যান্সার ফিরে আসা বা মৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম।

ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থা দুটি জানিয়েছে, ওষুধটি ইতোমধ্যেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে ‘Breakthrough Therapy’ স্বীকৃতি পেয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সমস্ত আইনি অনুমোদন মিললে আগামী বছরের (২০২৫) শুরুতেই সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার জন্য এটি বাজারে উপলব্ধ হতে পারে।

ভবিষ্যতে অন্যান্য ক্যান্সারেও আলো ছড়াবে

mRNA প্রযুক্তির এই সাফল্য শুধু মেলানোমাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বর্তমানে ফুসফুস, স্তন এবং অগ্ন্যাশয়ের (Pancreatic) ক্যান্সারের চিকিৎসাতেও এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা চলছে। চিকিৎসকদের মতে, ভবিষ্যতে প্রতিটি রোগীর টিউমারের ডিএনএ বা জিন বিশ্লেষণ করে তাঁদের জন্য পৃথক ভ্যাকসিন তৈরি করার এই পদ্ধতিই হতে চলেছে ক্যান্সার চিকিৎসার প্রধান চালিকাশক্তি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *