পাঠ্যবই ‘শুদ্ধকরণ’ বিতর্ক: ‘আম্মা’, ‘আসমান’, ‘নাস্তা’ শব্দ বাদ দিতে সক্রিয় পাঠ্যক্রম কমিটি!

কলকাতা: রাজ্য জুড়ে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে শব্দের ব্যবহার নিয়ে শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছিল, বিগত সরকারগুলির আমলে জোর করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাংলা ভাষায় অপ্রচলিত কিছু বিদেশি ও বিদেশি ভাবাপন্ন শব্দ ঢুকিয়ে ভাষার স্বাভাবিক চলন ও ঐতিহ্য বিকৃত করা হয়েছিল। সেই বিতর্কের জেরেই এবার প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবই সংস্কার ও ‘শব্দভান্ডার শুদ্ধকরণ’-এর কাজে হাত দিয়েছে রাজ্যের বর্তমান শিক্ষা দফতর ও পাঠ্যক্রম কমিটি।
শব্দ ও নাম বদলের উদ্যোগ: সম্প্রতি বিধাননগরের নিবেদিতা ভবনে পাঠ্যক্রম কমিটির তিন দিনের এক আবাসিক শিবিরে বেশ কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠে এসেছে। অভিযোগ, ‘মা’-এর জায়গায় ‘আম্মা’, ‘আকাশ’-এর বদলে ‘আসমান’, ‘স্নান’-এর বদলে ‘স্নান’, ‘বন্ধু’-র বদলে ‘দোস্ত’ বা ‘জলখাবার’-এর পরিবর্তে ‘নাস্তা’-র মতো যেসব শব্দ এপার বাংলায় সচরাচর ব্যবহৃত হয় না, সেগুলোকে বইয়ে স্থান দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ‘রামধনু’র বদলে ‘রংধনু’ করা এবং উদাহরণের ক্ষেত্রে পরিচিত বাংলা নামের বদলে নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় নাম বেশি ব্যবহারের অভিযোগও তোলা হয়। নতুন কমিটির মতে, ভাষার ঐতিহ্য বজায় রাখতেই এসব অপ্রচলিত শব্দ ও নাম বাদ দিয়ে স্বাভাবিক বাংলা শব্দ ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
বিতর্ক ও পাল্টা যুক্তি: ভাষা বিশেষজ্ঞ ও সাহিত্যিকদের একাংশের মতে, বহু বছর ধরে জোর করে বিদেশি শব্দ চাপিয়ে দিয়ে শিশুমনে বিভ্রান্তি ও বিভাজন তৈরি করা হয়েছিল। তবে প্রাক্তন পাঠ্যক্রম কমিটির সদস্য ও কিছু অধ্যাপকদের একাংশের দাবি, ভাষা দিয়ে ধর্মকে বিচার করা অনুচিত। বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করতেই বৈচিত্র্যময় শব্দের ব্যবহার করা হয়েছিল, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না।
অন্যান্য ক্ষেত্রে যা বদল আসছে: ১. ইতিহাসে দেশভাগ ও উদ্বাস্তু প্রসঙ্গ: ইতিহাস বইয়ে দেশভাগের যন্ত্রণা এবং লাঞ্ছিত উদ্বাস্তুদের কথা আরও বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ২. সামাজিক সংবেদনশীলতা: অহেতুক কোনো নির্দিষ্ট পেশা বা সম্প্রদায়কে ছোট করে দেখার মানসিকতা দূর করতে অঙ্কের বই বা অন্য উদাহরণের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হচ্ছে (যেমন: ‘গোয়ালা দুধে জল মেশায়’-এর জায়গায় সাধারণ নাম ব্যবহার)। ৩. কর্মশিক্ষার আধুনিকীকরণ: সনাতনী চাষবাসের বদলে শহর ও গ্রাম্য জীবনে কাজে লাগে এমন আধুনিক বিষয়—যেমন ছাদবাগান, কিচেন গার্ডেন বা ইনডোর প্ল্যান্টের পরিচর্যা ও ব্যবসায়ী দিকগুলি কর্মশিক্ষায় যোগ করার কথা ভাবা হচ্ছে।
সময় কম থাকায় আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য আপাতত সিলেবাসের ১০ শতাংশের মতো সংশোধন করা হবে বলে পাঠ্যক্রম কমিটি সূত্রে জানা গেছে।