চিকিৎসায় জালিয়াতি! বাংলায় ভুয়ো ডাক্তারের রমরমা, কাঠগড়ায় মেডিক্যাল কাউন্সিল

চিকিৎসায় জালিয়াতি! বাংলায় ভুয়ো ডাক্তারের রমরমা, কাঠগড়ায় মেডিক্যাল কাউন্সিল

সোনারপুরে জাল ‘অঙ্কোলজিস্ট’ গ্রেফতারের পর রাজ্যজুড়ে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল ভুয়ো ডাক্তার বিতর্ক। কলকাতা থেকে শুরু করে জেলার আনাচে-কানাচে গ্যাংরিনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে এই জালিয়াতি চক্র। চিকিৎসক সংগঠনগুলির গুরুতর অভিযোগ, গত ১৫ বছর ধরে মেডিক্যাল কাউন্সিলের অসাধু সদস্যরা অর্থের বিনিময়ে ভুয়ো ডিগ্রি ও রেজিস্ট্রেশন পাইয়ে দিয়েছেন। ফলে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে একাধিক ভুয়া চিকিৎসক।

সম্প্রতি দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরের ঘাসিয়াড়া এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় এক ব্যক্তিকে, যিনি নিজেকে প্রখ্যাত ‘অঙ্কোলজিস্ট’ বলে দাবি করতেন। তাঁর কাছে এমবিবিএস (MBBS) ও এফআরসিএস (FRCS)-এর মতো বড় ডিগ্রি রয়েছে বলে পুলিশকে জানানো হলেও, তদন্তে জানা যায় সেগুলি সবই ভুয়া। শুধু সোনারপুর নয়, সম্প্রতি বীরভূম থেকে শুরু করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও ভুয়ো ডাক্তারের হদিস মিলেছে। কোথাও আবার ইউটিউব দেখে অস্ত্রোপচারের মতো চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।

এই পরিস্থিতিতে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠন। বিজেপি ডক্টর্স ফোরামের নেতা ডা. তন্ময় মুখোপাধ্যায়ের অভিযোগ, “রাজ্যের মেডিক্যাল কাউন্সিল সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও শীতঘুমে রয়েছে। ২০১৭ সালে প্রায় ৫০০ জন ভুয়ো ডাক্তারের বিরুদ্ধে সিআইডি তদন্ত শুরু হলেও আজও কেউ শাস্তি পায়নি।” তিনি অভিযোগ করেন, ২০২২ সালের মেডিক্যাল কাউন্সিল নির্বাচনে কারচুপি করে একচ্ছত্র প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতি চালানো হচ্ছে। এর দায় নিয়ে মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি সুদীপ্ত রায়ের পদত্যাগ এবং রাজ্য সরকারের কাছে কড়া এফআইআর দায়ের করে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের সম্পাদক ডা. উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় বড়সড় দুর্নীতির আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “গত ১৫ বছর ধরে মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড—সবত্রই এক অসাধু চক্র সক্রিয়। ভুয়ো ডাক্তারের সংখ্যা পাঁচ-সাতজন নয়, অনেক বেশি হতে পারে।” তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জাল চিকিৎসক এবং তাদের সার্টিফিকেট প্রদানকারী অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপের দাবি জানান।

একই সুর রাষ্ট্রবাদী চিকিৎসক সংগঠন এনএমও-র (NMO) দক্ষিণবঙ্গের সম্পাদক ডা. অর্পণ পালের গলায়। তিনি বলেন, “সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণি পাশ করে অনেকে নিজেকে এমডি, এমএস বা সুপার স্পেশালিস্ট বলে দাবি করছে। এটি পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে বড় প্রতারণা।” ভুয়ো ডাক্তার ও তাদের মদতদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।

চিকিৎসক মহল মনে করছে, শুধুমাত্র ভুয়ো ডাক্তারদের গ্রেফতার করাই যথেষ্ট নয়; যে অসাধু চক্রের মাধ্যমে এই ভুয়ো রেজিস্ট্রেশন ও ডিগ্রি বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে, তার মূল উৎপাটন করা জরুরি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *