‘ফেরার পর ওজন কমে দাঁড়ায় ৫৬ কেজিতে!’ কার্গিল যুদ্ধে অভিনেতা নানা পাটেকরের ঐতিহাসিক লড়াইয়ের দিনগুলো

অভিনয় জগতে তিনি ছিলেন এক অনন্য নক্ষত্র। তবে পর্দার অভিনয় ছাপিয়ে বাস্তব জীবনেও দেশপ্রেমে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন প্রবীণ অভিনেতা নানা পাটেকর। সম্প্রতি তাঁর জীবনের অবসান ঘটার পর আবারও চর্চায় উঠে এসেছে ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণের সেই ঐতিহাসিক গল্প।
যুদ্ধের সময় সাধারণত বিনোদন জগতের তারকারা বার্তা দিয়ে বা বক্তব্য রেখে সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়ান। কিন্তু নানা পাটেকর কেবল শুভেচ্ছাবার্তাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিলেন।
জর্জ ফার্নান্ডেজ ও ‘কুইক রিয়্যাকশন টিম’ ১৯৯৯ সালের মে মাসে ‘অপারেশন বিজয়’-এর সময় যখন পাক অনুপ্রবেশকারীরা মুশকো, দ্রাস, কাকসার ও কার্গিল সেক্টরে ঢুকে পড়ে, তখন নানা পাটেকর নিজে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজ়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। শুরুতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী সম্মতি না দিলেও পরবর্তীতে তাঁকে অনুমতি দেন।
কার্গিলে প্রায় ৬০ দিন ‘কুইক রিয়্যাকশন টিম’-এর সদস্য হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধের স্মৃতি হাতড়ে নানা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “যখন কার্গিলে যাই, আমার ওজন ছিল ৭৬ কেজি। দুই মাস পর যখন ফিরি, তখন ওজন কমে দাঁড়ায় ৫৬ কেজিতে। দেশের জন্য এটুকু তো করাই যায়।”
সেনাছাউনিতে মনোবল বৃদ্ধি তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কার্গিলের এক সেনাছাউনি থেকে অন্য সেনাছাউনিতে ঘুরে ঘুরে জওয়ানদের মনোবল বাড়াতেন নানা পাটেকর। তাঁদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে ও বিনোদন জুগিয়ে জওয়ানদের মানসিক জোর বাড়াতে তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন।
‘প্রহার’ ছবি থেকে টেরিটোরিয়াল আর্মি ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সেরা মিলিটারি ড্রামা ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’-এ মেজর ভি এস চৌহানের চরিত্রে অভিনয় করার সময় থেকেই সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ওই চরিত্রের প্রস্তুতির জন্য তিনি কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ নেন এবং তিন বছর মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রিতে কাটান। আশির দশকের শেষ দিকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে টেরিটোরিয়াল সেনাবাহিনীতেও যোগ দেন। রাইফেল শুটিংয়ে তাঁর পারদর্শিতা ও সামরিক প্রশিক্ষণ দেখেই তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাঁকে কার্গিলে পাঠাতে সম্মত হয়েছিলেন।
নানা পাটেকরের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করে প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল ভি কে সিং স্মৃতিচারণ করে জানান, চরিত্রে গভীরে প্রবেশ করা এবং কঠোর পরিশ্রমের যে দৃষ্টিভঙ্গি নানা পাটেকরের ছিল, তা কাজের মান বহুগুণ বাড়িয়ে দিত। পর্দা থেকে কার্গিলের যুদ্ধক্ষেত্র—নানা পাটেকরের এই দেশপ্রেমের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।