“ছেলের হাতে বন্দুক নয়, বই চাই”— যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে আতঙ্কিত মায়েদের আর্তনাদ

ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনা বর্তমানে যুদ্ধবিরতি পর্যায়ে থাকলেও তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে দেশটির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। যুদ্ধের ভয়াবহ দামামা আর বোমার শব্দে আজ বিপর্যস্ত লাখো শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সামান্য কোনো শব্দ বা ঘরের দরজা জোরে বন্ধ হলেও শিউরে উঠছে শিশুরা। তাদের কাছে প্রতিটি শব্দই যেন একেকটি বোমার বিস্ফোরণ।
হাইপার অ্যারাউজাল ও শিশুদের মানসিক সংকট
ইরানের প্রায় ২০ শতাংশ জনসংখ্যা অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি মানুষ ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু। যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এই বিশাল সংখ্যক শিশুকে ‘হাইপার অ্যারাউজাল’ নামক এক জটিল মানসিক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কারণ দীর্ঘমেয়াদে এটি পোস্ট ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি (PTSD)-এর মতো গুরুতর মানসিক রোগের জন্ম দিতে পারে।
১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের ভাষ্যমতে, যুদ্ধের আগে জীবন ছিল চিন্তামুক্ত। কিন্তু এখন ছোটখাটো যেকোনো শব্দেই তার মস্তিষ্ক অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। যুদ্ধবিমানের গর্জন আর বিস্ফোরণের কম্পন শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
যুদ্ধের ময়দানে যখন শিশুরা
ভয়াবহ যুদ্ধের এই আবহে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো শিশুদের যুদ্ধে পাঠানোর প্রবণতা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কড়া সমালোচনা সত্ত্বেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন উসকানি দেখা গেছে।
- প্রাণহানি: সাম্প্রতিক লড়াইয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ২৫৪ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
- যুদ্ধাপরাধ: ১১ বছর বয়সী আলিরেজা জাফরির মতো অনেক শিশু চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকালে ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, শিশুদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া স্পষ্টত একটি যুদ্ধাপরাধ।
- শিক্ষাব্যবস্থা বিপর্যস্ত: স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং পথে পথে সামরিক বাহিনীর কড়া পাহারার কারণে শিশুরা নিজ বাড়িতেই বন্দি জীবন কাটাচ্ছে।
মায়েদের আর্তনাদ ও সামাজিক উদ্বেগ
সন্তানদের জীবন বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন মায়েরা। নূর নামের এক মা তার ১২ বছর বয়সী ছেলেকে রক্ষা করতে তেহরান ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন। তিনি জানান, শিশুরা যুদ্ধকে অনেক সময় ভিডিও গেম মনে করে ভুল করে, কিন্তু বাস্তবে একবার রণক্ষেত্রে গেলে ফিরে আসার পথ থাকে না। কোনোভাবেই নিজের সন্তানকে যুদ্ধের বলি হতে দেবেন না বলে সংকল্প করেছেন তিনি।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও বর্তমান পরিস্থিতি
পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা চললেও শিশুদের মনের ক্ষত মোছা সহজ নয়। যুদ্ধের শারীরিক ক্ষত হয়তো শুকিয়ে যায়, কিন্তু শৈশবে পাওয়া মানসিক আঘাত সারাজীবনের জন্য স্থায়ী হতে পারে। শান্তি চুক্তি হলেও এই শিশুদের হারানো শৈশব ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
একঝলকে
- আক্রান্ত জনসংখ্যা: ইরানের প্রায় ২ কোটি শিশু যুদ্ধের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
- মানসিক ঝুঁকি: শিশুরা ‘হাইপার অ্যারাউজাল’ ও পিটিএসডি-র মতো সমস্যায় ভুগছে।
- শিশু মৃত্যু: এখন পর্যন্ত যুদ্ধে ২৫৪ জন শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে।
- আন্তর্জাতিক অবস্থান: শিশুদের যুদ্ধে ব্যবহারকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে দেখছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
- বর্তমান অবস্থা: স্কুল বন্ধ এবং শিশুরা এক প্রকার গৃহবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।