লোকসভার আসন বেড়ে ৮৫০? উত্তর ভারতের দাপট বৃদ্ধি না দক্ষিণ ভারতের অধিকার খর্ব—কোন পথে দেশের রাজনীতি?

ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে আসন্ন বাজেট অধিবেশন। ১৬ এপ্রিল ২০২৬ থেকে শুরু হতে যাওয়া এই অধিবেশনে সংবিধানের ১৩১তম সংশোধনী বিল এবং সীমানা পুনর্বিন্যাস (Delimitation) বিল পেশ করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লোকসভা ও বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ প্রক্রিয়া দ্রুত কার্যকর করতেই এই পদক্ষেপ। তবে এই বিল পাশ হলে লোকসভার আসন সংখ্যা ও বিভিন্ন রাজ্যের প্রতিনিধিত্বে আমূল পরিবর্তন আসবে, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক।
আসন সংখ্যা বৃদ্ধি ও নতুন সমীকরণ
প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, লোকসভার বর্তমান সর্বোচ্চ আসন সংখ্যা ৫৫০ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮১৫টি আসন রাজ্যগুলোর জন্য এবং ৩৫টি আসন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর জন্য বরাদ্দ থাকবে। এই নতুন বিন্যাসে মূলত ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্যকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে। যদি এই প্রস্তাব কার্যকর হয়, তবে উত্তর ভারতের ‘হিন্দি বলয়’ হিসেবে পরিচিত রাজ্যগুলোর ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। পরিসংখ্যান বলছে, হিন্দি বলয়ের প্রতিনিধিত্ব ৩৮.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৩.১ শতাংশ হতে পারে। বিপরীতে, দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব ২৪.৩ শতাংশ থেকে কমে ২০.৭ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিরোধীদের আপত্তি ও নেপথ্য কারণ
কংগ্রেসসহ একাধিক বিরোধী দল এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছে। কংগ্রেস সাংসদ অভিষেক মনু সিংভি একে ‘ব্যাকডোর ডিলিমিটেশন’ বা চোরাপথে সীমানা নির্ধারণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বিরোধীদের দাবি, মহিলা সংরক্ষণের আড়ালে মূলত ২০২৯ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে শাসক দল। তাদের অভিযোগ, এই বিল নিয়ে কোনো সর্বদলীয় বৈঠক করা হয়নি এবং অধিবেশন শুরুর মাত্র ৩৬ ঘণ্টা আগে এটি সামনে আনা হয়েছে। সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস মনে করেন, এই ব্যবস্থা দেশের বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রাজ্যভিত্তিক সম্ভাব্য আসনের পরিবর্তন
যদি ২০১১ সালের জনসংখ্যার ভিত্তিতে ৮১৫টি আসনের বণ্টন হয়, তবে বড় রাজ্যগুলোর চিত্র হবে নিম্নরূপ:
- উত্তরপ্রদেশ: আসন সংখ্যা ৮০ থেকে বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১৩৮-এ (৫৮টি আসন বৃদ্ধি)।
- বিহার: বর্তমানের ৪০টি আসন বেড়ে হতে পারে ৭২টি।
- মহারাষ্ট্র: আসন ৪৮ থেকে বেড়ে ৭৮ হওয়ার সম্ভাবনা।
- তামিলনাড়ু: আসন ৩৯ থেকে বেড়ে হবে ৫০টি।
- কেরল: আসন সংখ্যা ২০ থেকে সামান্য বেড়ে ২৩ হতে পারে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আঞ্চলিক উদ্বেগ
বর্তমানে লোকসভার আসন বণ্টন ১৯৭১ সালের আদমশুমারির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত। অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকারের আমলে ২০০১ সালে একটি রাজনৈতিক ঐকমত্যের মাধ্যমে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই আসন সংখ্যা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো—যেমন তামিলনাড়ু, কেরল ও কর্ণাটক—দাবি জানিয়েছিল যেন এই সময়সীমা আরও ২৫ বছর বাড়ানো হয়। তাদের আশঙ্কা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়ার কারণে তাদের আসন সংখ্যা এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোর তুলনায় কমে যাচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার সেই দাবি আমলে না নিয়ে দ্রুত এই বিল পাসের পথে হাঁটছে।
একঝলকে
- লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৫০ থেকে বেড়ে ৮৫০ করার প্রস্তাব।
- হিন্দি বলয়ের রাজনৈতিক প্রভাব ৩৮.১% থেকে বেড়ে ৪৩.১% হওয়ার সম্ভাবনা।
- দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর সম্মিলিত আসন ২৪.৩% থেকে কমে ২০.৭% হতে পারে।
- উত্তরপ্রদেশে সর্বোচ্চ ৫৮টি এবং বিহারে ৩২টি আসন বাড়তে পারে।
- মহিলাদের জন্য ৩৩% আসন সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে এই বিলে।
- বিরোধীদের অভিযোগ, এটি ২০২৯ সালের নির্বাচনের জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।