ভোটার তালিকায় ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’র ছায়া, বাংলায় লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার কি সংকটে

ভোটার তালিকায় ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’র ছায়া, বাংলায় লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার কি সংকটে

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটার তালিকায় বড়সড় রদবদল নিয়ে ঘনীভূত হচ্ছে রাজনৈতিক বিতর্ক। ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ বা তথ্যগত অসঙ্গতির অজুহাতে রাজ্যজুড়ে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারকে এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ বা ২৭ লক্ষ নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ যেতে পারে। ইতিপূর্বে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) মাধ্যমে বাদ পড়া নামগুলো ধরলে এই সংখ্যা প্রায় ৭৬.২ লক্ষে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তালিকায় এই বিপুল সংখ্যক ছাঁটাই নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। বিশেষ করে প্রথম পর্যায়ের ১৫২টি আসনে প্রায় ১৪.৪ লক্ষ ভোটার বর্তমান নির্বাচনে আর অংশ নিতে পারবেন না, কারণ ভোটার তালিকা ইতিমধ্যে ‘ফ্রিজ’ বা সংশোধন অযোগ্য হয়ে গিয়েছে। কমিশনের এই প্রক্রিয়ায় ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’-র সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড কী, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। ভাষাগত বৈচিত্র্যপূর্ণ এই রাজ্যে নামের বানানে সামান্য হেরফের বা ঠিকানার পরিবর্তনকে সন্দেহের ভিত্তি করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজরে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভৌগোলিক ও জনতাত্ত্বিক প্রভাব। পরিসংখ্যান বলছে, মুর্শিদাবাদ ও মালদহের মতো মুসলিম-অধ্যুষিত জেলাগুলিতেই এই প্রক্রিয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ফলে এই বিপুল নাম কর্তন কি নিছক প্রশাসনিক সংস্কার নাকি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অভিসন্ধি, তা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে শাসকদলের পক্ষ থেকে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগ নতুন করে জোরালো হচ্ছে।

আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাইব্যুনাল গঠনের নির্দেশ দিলেও কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়নি। ফলে নির্বাচন কমিশন ডিজিটালি স্বাক্ষরিত আদেশ আপলোডে বিলম্বের যে যুক্তি দিচ্ছে, তাতে কার্যকর প্রতিকার মিলছে না। গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ যখন সর্বাধিক অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছতা, তখন এই অস্পষ্ট প্রক্রিয়া এবং লাখ লাখ নাগরিকের ভোটাধিকার হারানো নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না ফিরলে এই বিশাল কর্মকাণ্ড কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবেই থেকে যাবে, যা সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *