বাংলার মাটিতেই ব্রাত্য! নাগরিকত্ব প্রমাণের পরীক্ষায় মুর্শিদাবাদের ৬ ‘বাংলাদেশি’

বাংলার মাটিতেই ব্রাত্য! নাগরিকত্ব প্রমাণের পরীক্ষায় মুর্শিদাবাদের ৬ ‘বাংলাদেশি’

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে যখন উন্নয়নের বড় বড় প্রতিশ্রুতি আর রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে, তখন মুর্শিদাবাদ জেলার একদল মানুষের কাছে এই ভোট কেবল সরকার গঠনের মাধ্যম নয়। বেলডাঙ্গা ও হরিহরপাড়ার বাসিন্দা মিনারুল শেখ বা মহবুল শেখদের কাছে এবারের নির্বাচন নিজের হারানো পরিচয় ফিরে পাওয়ার এবং নিজেকে ‘ভারতীয়’ হিসেবে প্রমাণ করার এক কঠিন পরীক্ষা।

পরিচয় সংকটের নেপথ্যে যে যন্ত্রণার ইতিহাস

গত বছর কাজের সন্ধানে মহারাষ্ট্রে গিয়ে চরম হেনস্থার শিকার হন মুর্শিদাবাদের ৬ শ্রমিক। স্রেফ বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের জেলে বন্দি থাকার পর পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হস্তক্ষেপে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে তাঁরা দেশে ফেরেন। কিন্তু নিজভূমে ফেরার পরও কাটেনি তাঁদের শঙ্কা। নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়েছে সরকারি দপ্তরে।

ভোটের কালি যখন নাগরিকত্বের ঢাল

মুর্শিদাবাদের এই প্রান্তিক পরিবারগুলোর কাছে ভোটার স্লিপ এখন জীবনের চেয়েও দামি। মিনারুল শেখের কথায়, “গত বছর আমাকে বিদেশি বলে অন্য দেশে ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ভোট হবে আমার যোগ্য জবাব।” দীর্ঘ ৮ মাসের লড়াই আর ব্লক অফিসের অসংখ্যবার চক্কর কাটার পর অবশেষে তিনি তাঁর ভোটার স্লিপ হাতে পেয়েছেন। তাঁর কাছে এই ভোট কেবল সাংবিধানিক অধিকার নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার হাতিয়ার।

কেন আতঙ্কে মুর্শিদাবাদের গ্রামগুলো

মুর্শিদাবাদ জেলার সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৭.৪৮ লক্ষ নাম বাদ পড়ার খবর গ্রামগুলোতে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবারগুলো এখন চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে। হরিহরপাড়ার নাজিমুদ্দিন মন্ডল আজও তাঁর কাছে রেখে দিয়েছেন সেই ৩০০ বাংলাদেশি টাকা, যা তাঁকে বিতাড়নের সময় দেওয়া হয়েছিল। সেই নোটটি দেখলে আজও তিনি শিউরে ওঠেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, একই পরিবারের একজনের নাম ভোটার তালিকায় থাকলেও অন্য ভাইয়ের নাম রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে।

রাজনৈতিক সমীকরণ ও প্রভাব

এই মানবিক ইস্যুটি এখন স্থানীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, বাংলাভাষী মুসলিমদের টার্গেট করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো একে প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে। তবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই—পূর্বপুরুষরা এই দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও কেন আজ তাঁদের হাতে নথির ফোল্ডার নিয়ে ভারতীয় প্রমাণ করতে হচ্ছে?

একঝলকে

  • মহারাষ্ট্রে ধৃত মুর্শিদাবাদের ৬ শ্রমিককে বাংলাদেশি অপবাদ দিয়ে বিতাড়ন করা হয়েছিল।
  • দীর্ঘ আইনি লড়াই ও বাংলাদেশের জেলে থাকার পর তাঁরা নিজ গ্রামে ফিরেছেন।
  • শ্রমিকদের দাবি, পরিচয় হারানোর যন্ত্রণা দারিদ্র্যের চেয়েও অনেক বেশি।
  • মুর্শিদাবাদে সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে লক্ষ লক্ষ নাম।
  • এবারের ভোটে তাঁদের মূল লক্ষ্য রাস্তা বা বিদ্যুৎ নয়, বরং নিজেদের ভারতীয় প্রমাণ করা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *