বাংলার ভোটে ‘ইউপি মডেল’ ও বুলডোজার রাজনীতি, যোগীর হুঙ্কারে কি মেরুকরণের পথে কলকাতা?

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তাদের অন্যতম প্রধান প্রচারক হিসেবে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে ময়দানে নামিয়েছে। বিশেষ করে হিন্দিভাষী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে যোগীর সভা ঘিরে উন্মাদনা তুঙ্গে। উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকোর মতো এলাকায় তাঁর জনসভায় ‘বুলডোজার’ সংবলিত পোস্টার এবং ধর্মীয় স্লোগান রাজনীতির উত্তাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যোগী তাঁর ভাষণে তৃণমূল সরকারকে ‘হিন্দু বিরোধী’ আখ্যা দিয়ে আক্রমণ শানাচ্ছেন এবং কলকাতার জনবিন্যাস নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, যা সরাসরি মেরুকরণের রাজনীতির ইঙ্গিত দেয়।
হিন্দিভাষী বনাম বাঙালি আবেগ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যোগী আদিত্যনাথের উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভাবমূর্তি হিন্দিভাষী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হলেও বাঙালি ভোটারদের বড় অংশের মধ্যে তা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। কলকাতার শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের কাছে উত্তর ভারতের এই রাজনৈতিক কৌশল ‘বহিরাগত সংস্কৃতি’ হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। তৃণমূলের অভিযোগ, যোগী আদিত্যনাথ বাংলার সংস্কৃতি ও ভাষাকে অবমাননা করছেন। সমালোচকদের মতে, উত্তরপ্রদেশের মডেল বাংলায় প্রয়োগ করার চেষ্টা বিজেপিকে বাঙালি ভাবাবেগ বা ‘বেঙ্গলি প্রাইড’ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
তৃণমূলের মোকাবিলা ও গ্রামীণ সমীকরণ
তৃণমূল কংগ্রেস যোগীর এই আক্রমণকে হাতিয়ার করে পালটা প্রচার চালাচ্ছে যে, বিজেপি বাংলার নিজস্ব পরিচয় মুছে দিতে চায়। পাশাপাশি, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো তৃণমূলের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। অনেক সাধারণ ভোটার তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ক্ষুব্ধ হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনহিতকর প্রকল্পের ওপর আস্থা রাখছেন। বিজেপির ৩০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও সংগঠনের অভাবে তা গ্রামীণ ভোটারদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে।
ভোটের ময়দানে প্রভাব
যোগীর এই প্রচারের ফলে উত্তর ও মধ্য কলকাতার হিন্দিভাষী বলয়ে বিজেপি সুবিধা পেতে পারে, যা মূলত ভোটব্যাঙ্ককে সংহত করার কৌশল। তবে বাংলার সামগ্রিক জনবিন্যাসে মুসলিম বিরোধী বা উগ্র ধর্মীয় স্লোগান আদতে তৃণমূলের বিরোধী ভোটকে একজোট করার বদলে বিভক্ত করে দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শেষ পর্যন্ত এই মেরুকরণের রাজনীতির লড়াইয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলোই বড় নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এক ঝলকে
- যোগী আদিত্যনাথ কলকাতার হিন্দিভাষী এলাকাগুলোতে তৃণমূলের বিরুদ্ধে হিন্দু বিরোধী এবং তোষণের রাজনীতির অভিযোগ তুলছেন।
- বিশ্লেষকদের মতে, যোগীর উগ্র রাজনৈতিক ভাষা বাঙালি ভাবাবেগে আঘাত করায় তা হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
- দুর্নীতি নিয়ে জনমানসে ক্ষোভ থাকলেও ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো প্রকল্প মমতার পক্ষে জনমত ধরে রাখতে সাহায্য করছে।
- বিজেপির কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উত্তর ভারতের হিন্দুত্ববাদী মডেলকে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়ানো।