পরাজিত মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা দিতে অস্বীকার, সে ক্ষেত্রে সংবিধান ও আইন কী বলছে?

পরাজিত মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা দিতে অস্বীকার, সে ক্ষেত্রে সংবিধান ও আইন কী বলছে?

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইস্তফা না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে। ভারতের সংবিধানের বিধি অনুযায়ী, জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো ব্যক্তি বা মন্ত্রিসভা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যপাল এবং রাষ্ট্রপতির হাতে কী কী আইনি ক্ষমতা রয়েছে, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

রাজ্যপালের হাতে বরখাস্ত করার ক্ষমতা

ভারতীয় সংবিধানের ১৬৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভা রাজ্যপালের ‘সন্তুষ্টি’ (Pleasure of the Governor) পর্যন্ত ক্ষমতায় আসীন থাকেন। যখন বিধানসভা নির্বাচনের ফল স্পষ্ট করে দেয় যে বর্তমান সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে, তখন সেই মন্ত্রিসভা শাসন করার নৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার হারিয়ে ফেলে। এমতাবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী নিজে থেকে ইস্তফা না দিলে, রাজ্যপাল নিজের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাঁকে এবং তাঁর মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করতে পারেন।

নতুন সরকারের শপথ ও স্বয়ংক্রিয় অবসান

সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজ্যপাল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা বৃহত্তম জোটের নেতাকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানান। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করার মুহূর্তেই পুরোনো সরকারের মেয়াদ এবং বৈধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। অর্থাৎ, পুরোনো মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগপত্র জমা না দিলেও নতুন সরকারের শপথের ফলে আগের মন্ত্রিসভা আর আইনি অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে না।

প্রশাসনিক নির্দেশ ও ‘ফ্রিজ’ হওয়ার সম্ভাবনা

যদি পরাজিত মুখ্যমন্ত্রী গদি আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করেন, তবে রাজ্যপাল সচিবালয় থেকে মুখ্যসচিব এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে যাতে তাঁরা বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর কোনো আদেশ পালন না করেন। অর্থাৎ, ৭ মে বা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক ক্ষমতা আইনিভাবে ‘ফ্রিজ’ করে দেওয়া হতে পারে। এই অবস্থায় সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ ব্যয় বা কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর আর থাকবে না।

রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশ (ধারা ৩৫৬)

মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফা না দিয়ে যদি রাজ্যে এক অচলবস্থা বা সাংবিধানিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করেন, তবে রাজ্যপাল সংবিধানের ৩৫৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেন্দ্রে রিপোর্ট পাঠাতে পারেন। এতে জানানো হতে পারে যে রাজ্যে সাংবিধানিক যন্ত্র (Constitutional Machinery) ভেঙে পড়েছে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি ওই রাজ্যে সরাসরি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারেন এবং বিধানসভাকে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে পারেন।

তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রী বা কেয়ারটেকার সরকার

স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ভোটের ফল বেরোনোর পর মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করেন এবং রাজ্যপাল তাঁকে পরবর্তী সরকার না আসা পর্যন্ত ‘তত্ত্বাবধায়ক’ হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু যদি তিনি ইস্তফা দিতেই অস্বীকার করেন, তবে রাজ্যপাল সেই সৌজন্যমূলক সুযোগ না দিয়ে সরাসরি বরখাস্তের পথে হাঁটতে পারেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাব থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক। এক্ষেত্রে রাজ্যপালই হলেন সংবিধানের রক্ষক এবং তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

প্রতিবেদক: বর্তমান ঠাকুর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *