আইপ্যাক কি তৃণমূলের জন্য কাজ করছিল, নাকি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার কাজ

আইপ্যাক কি তৃণমূলের জন্য কাজ করছিল, নাকি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার কাজ

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ২০১৯ সালের পরবর্তী অধ্যায়ে ‘আইপ্যাক’ (I-PAC) ছিল এক অতি পরিচিত নাম। কিন্তু ২০২৬-এর এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দল ও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে— এই পেশাদারি সংস্থা কি আদেও তৃণমূলের জন্য কাজ করছিল, নাকি তাদের মূল লক্ষ্য ছিল কেবল ‘ক্যামাক স্ট্রিট’ বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা?

কর্পোরেট রাজনীতি বনাম দিদির আবেগ

তৃণমূলের জন্ম ও উত্থান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াই এবং আবেগের ওপর ভিত্তি করে। ২০১৯-এর ধাক্কার পর যখন আইপ্যাকের প্রবেশ ঘটে, তখন থেকেই দলের ‘ওল্ড স্কুল’ রাজনীতির সঙ্গে কর্পোরেট স্টাইলের সংঘাত শুরু হয়। ‘বাংলার গর্ব মমতা’র মতো দম্ভসূচক প্রচার থেকে শুরু করে ‘দিদিকে বলো’— কৌশলী চালগুলো সাময়িক সাফল্য দিলেও দলের অন্দরে আদি ও নব্যের যে ফাটল তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল এই ভোটকুশলী সংস্থা।

প্যারালাল প্রশাসন ও আইপ্যাকের ছড়ি ঘোরানো

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সেনাপতি’ হিসেবে উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে আইপ্যাকের ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। জেলাগুলোতে ‘অবজার্ভার’ পদ তুলে দিয়ে আইপ্যাকের কর্মীদের হাতে রাশ ছেড়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ ওঠে, দলের অভিজ্ঞ নেতাদের পাশ কাটিয়ে আইপ্যাকের ‘ছেলেরা’ই ঠিক করত কে প্রার্থী হবে বা কার কতটা গুরুত্ব থাকবে। অনেক ক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে পদ পাইয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও দলের অলিন্দে শোনা গিয়েছে।

সাংস্কৃতিক দূরত্ব ও অবাস্তব প্রচার

আইপ্যাকের বিরুদ্ধে সবথেকে বড় অভিযোগ হলো বাংলার নাড়ির স্পন্দন বুঝতে না পারা। অনেক কর্মীই ছিলেন অবাঙালি, যাঁরা স্থানীয় মানুষের ভাষাই বুঝতেন না। প্রচারের নামে দরজায় স্টিকার লাগানো বা রাজনৈতিক ‘লুডো’ খেলার মতো অবাস্তব পরিকল্পনা তৃণমূল কর্মীদের হাস্যাস্পদ করে তুলেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে মানুষের পালস বোঝেন, আইপ্যাক সেখানে কেবল ‘ডেটা’র ওপর ভরসা করে অঙ্ক কষতে চেয়েছিল, যা শেষমেশ বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।

সংকটে নিরুদ্দেশ এবং ‘সুখের পায়রা’ তকমা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইপ্যাক আসলে ‘সুখের পায়রা’। যখন দল জয়ের হাওয়ায় ভাসে, তখন যাবতীয় কৃতিত্ব নিজেদের পকেটে পুরতে তারা সিদ্ধহস্ত। কিন্তু ‘আরজি কর’ কাণ্ডের মতো যখন রাজ্য উত্তাল ছিল, তখন এই পেশাদারি সংস্থাকে দূরবীন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায়নি। দলের বিপদে স্ট্র্যাটেজি দেওয়ার বদলে তারা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল।

ক্যামাক স্ট্রিটের সচিবালয় ও নিয়ন্ত্রণ

তৃণমূলের একাংশের মতে, আইপ্যাক আসলে গোটা দলের প্রতিনিধি না হয়ে একটি নির্দিষ্ট শিবিরের স্বার্থরক্ষায় নিয়োজিত ছিল। প্রতীক জৈনের মতো কুশলীরা কালীঘাটের চেয়ে ক্যামাক স্ট্রিটের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বেশি সচেষ্ট ছিলেন। প্রার্থীতালিকায় আমূল বদল থেকে শুরু করে ‘ডায়মন্ড মডেল’ তৈরি— সবকিছুর লক্ষ্য ছিল দলের অন্দরে একটি সমান্তরাল ক্ষমতা কাঠামো গড়ে তোলা। এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং ‘প্যাক প্যাক’ ধ্বনিই কি তবে তীরের কাছে এসে তরী ডোবানোর অন্যতম কারণ?

প্রতিবেদক— বর্তমান ঠাকুর।

আপনার কি মনে হয় বাংলার মতো আবেগনির্ভর ও গ্রাসরুট রাজনীতির ময়দানে এই ধরনের ‘ডেটা-নির্ভর’ কর্পোরেট সংস্কৃতি কি দীর্ঘমেয়াদীভাবে সফল হওয়া আদেও সম্ভব?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *