বাংলার মসনদে ‘রাম’, নেপথ্যে কি ‘বাম’? লাল দুর্গে পদ্ম ফোটানোর নেপথ্য কাহিনী

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর ফলাফল রাজ্যের গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক সমীকরণকে ওলটপালট করে দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপির এই ঐতিহাসিক জয়ের নেপথ্যে উঠে আসছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবার বাংলার মসনদ দখলে ‘রাম’ শিবিরের প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বাম’ ভোট। বিশেষ করে দক্ষিণপন্থী বিজেপির পক্ষে বামপন্থী ভোটারদের এই গণপ্রস্থান রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।
স্বয়ং নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুর কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার পর তার বিজয় ভাষণে বাম ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ভবানীপুর কেন্দ্রে সিপিআইএম-এর অন্তত ১০ হাজার ভোট সরাসরি তার ঝুলিতে এসেছে। এই প্রবণতা শুধু একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং গোটা রাজ্য জুড়েই ‘এবার রাম, পরে বাম’ স্লোগানটি কার্যকর হতে দেখা গেছে।
অস্তিত্ব রক্ষা ও তৃণমূল বিরোধী পুঞ্জীভূত ক্ষোভ
বাম সমর্থকদের এই অভাবনীয় পরিবর্তনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ২০১১ সালে ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই তৃণমূলের শাসনামলে বাম কর্মী-সমর্থকরা ব্যাপক রাজনৈতিক চাপের মুখে ছিলেন বলে অভিযোগ। দলীয় কার্যালয় দখল থেকে শুরু করে শারীরিক নিগ্রহের শিকার হওয়া—সব মিলিয়ে বাম ক্যাডারদের বড় অংশ বিজেপিকে একটি ‘লাইফ ইন্স্যুরেন্স পলিসি’ হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের ধারণা ছিল, তৃণমূলের হাত থেকে বাঁচতে বিজেপিই একমাত্র শক্তিশালী বিকল্প।
২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে হওয়া হিংসা এই ক্ষোভকে আরও উস্কে দিয়েছিল। তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করাই ছিল বামপন্থীদের প্রধান লক্ষ্য। কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে বাম ভোটাররা নিজেদের ভোটটি বিজেপির পক্ষে প্রয়োগ করেন, যাতে তৃণমূলকে পরাজিত করা নিশ্চিত হয়।
বাম দুর্গের পতন ও বিজেপির উত্থান
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালে বামফ্রন্টের ভোট শেয়ার যেখানে ছিল ৪১.০৯ শতাংশ, ২০২৬ সালের নির্বাচনে তা তলানিতে এসে ঠেকেছে। এর বিপরীতে সরাসরি লাভবান হয়েছে বিজেপি। একদা বামেদের অভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত যাদবপুর, উত্তরপাড়া এবং দমদম উত্তরের মতো আসনগুলোতে এবার পদ্ম ফুটেছে। এমনকি দীপ্সিতা ধর বা মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের মতো তরুণ বাম মুখগুলিও জয়ের মুখ দেখতে পাননি।
তবে বাম সমর্থকদের বড় অংশ মনে করছে, এটি আদর্শগত পরিবর্তন নয় বরং একটি রণকৌশল। তৃণমূল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাজ্যজুড়ে অনেক জায়গায় বিজেপির উপস্থিতিতেই বামেদের পুরনো দলীয় কার্যালয়গুলো পুনরায় খোলা হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, তৃণমূলহীন বাংলায় বামপন্থীরা নিজেদের হারানো জমি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। বিধানসভায় শক্তি কমলেও ডোমকল বা ভাঙড়ের মতো কিছু আসনে বাম ও তাদের সহযোগীদের জয় ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তৃণমূল বিরোধী এই মেরুকরণ আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে আরও নতুন মোড় নিয়ে আসতে পারে।