স্ত্রী নিজের কেরিয়ারকে গুরুত্ব দিলে তা নিষ্ঠুরতা নয়, ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিম কোর্টের

স্ত্রী নিজের কেরিয়ারকে গুরুত্ব দিলে তা নিষ্ঠুরতা নয়, ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিম কোর্টের

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও কি নারীর নিজস্ব স্বপ্ন বা পরিচিতি থাকতে নেই? কর্মজীবী নারীদের অধিকার ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নিয়ে চলা এক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ শোনাল দেশের শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছে, একজন বিবাহিত নারী যদি তাঁর পেশাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা কেরিয়ারকে প্রাধান্য দেন, তবে তাকে কোনোভাবেই স্বামীর প্রতি ‘নিষ্ঠুরতা’ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট করেছে যে, স্ত্রীর স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে স্বামীর আবেগে আঘাত লাগার যুক্তিটি আসলে অত্যন্ত অনুন্নত ও পিছিয়ে থাকা মানসিকতার পরিচয়।

সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার অবসান

মামলাটির সূত্রপাত হয়েছিল এক দন্তচিকিৎসক স্ত্রী এবং তাঁর সেনা আধিকারিক স্বামীর দাম্পত্য কলহকে কেন্দ্র করে। ২০০৯ সালে বিয়ের পর স্ত্রী নিজের পেশাগত কারণে আলাদা থাকতে শুরু করলে স্বামী সেটিকে ‘মানসিক নিষ্ঠুরতা’ এবং ‘স্বামী ত্যাগ’ হিসেবে দাবি করেন। নিম্ন আদালত ও হাইকোর্ট স্বামীর পক্ষে রায় দিলেও সুপ্রিম কোর্ট সেই যুক্তি খারিজ করে দিয়েছে। আদালতের মতে, স্ত্রী স্বামীর পরিবারের কোনো নিছক ‘সংযোজন’ নন। একজন উচ্চশিক্ষিত নারী কেবল দাম্পত্যের চার দেওয়ালে নিজেকে বন্দি রাখবেন, এমন প্রত্যাশা করা ভুল। বিচারপতিরা প্রশ্ন তোলেন, যদি স্ত্রীর বদলিযোগ্য চাকরি হতো, তবে কি সমাজ একইভাবে স্বামীকে কাজ ছেড়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর নির্দেশ দিত? এই ধরনের বৈষম্যমূলক চিন্তা আসলে সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

অধিকার ও বাস্তবতার ভারসাম্য

আদালতের এই রায়ে কর্মজীবী নারীদের স্বতন্ত্র বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাগত পরিচিতির ওপর আইনি শিলমোহর দেওয়া হয়েছে। যদিও দীর্ঘ তিক্ততা এবং স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের কারণে আদালত বিচ্ছেদের ডিক্রি বহাল রেখেছে, তবে ওই নারীর ওপর থেকে ‘নিষ্ঠুরতার’ কলঙ্ক মুছে দেওয়া হয়েছে। এই পর্যবেক্ষণের ফলে ভবিষ্যতে কর্মজীবী নারীদের অধিকার রক্ষার লড়াই আরও মজবুত হবে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। এই রায় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সংসার ও কেরিয়ারের ভারসাম্য রক্ষা করা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের দায়িত্ব এবং বিয়ের দোহাই দিয়ে নারীদের পেশাগত ডানা ছাঁটা আইনত দণ্ডনীয় ও সামাজিকভাবে নিন্দনীয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *