সব বাধা পেরিয়ে সাফল্যের আলোয় ঝাড়গ্রামের রূপান্তরকামী আলিয়া

সব বাধা পেরিয়ে সাফল্যের আলোয় ঝাড়গ্রামের রূপান্তরকামী আলিয়া

সমস্ত সামাজিক অবজ্ঞা, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং উপহাসকে হেলায় হারিয়ে এক অনন্য নজির গড়লেন ঝাড়গ্রামের আলিয়া। একসময় যার পরিচয় ছিল অনুভব, আজ সে সমস্ত মানসিক ও শারীরিক লড়াই পার করে নিজের নারীসত্ত্বাকে পূর্ণতা দিয়েছে। চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যের একমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে ৬৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে সমাজকে এক নতুন বার্তা দিলেন এই লড়াকু রূপান্তরকামী পড়ুয়া।

ঝাড়গ্রাম শহরের বামদা এলাকার বাসিন্দা আলিয়ার এই সাফল্যের পথ একেবারেই মসৃণ ছিল না। মাত্র দশ বছর বয়স থেকেই নিজের মনের ভেতরের ভিন্নতা টের পেয়েছিলেন তিনি। ছেলেদের খেলাধুলো ছেড়ে মেয়েদের সঙ্গে পুতুল খেলা বা সৃজনশীল কাজেই বেশি আনন্দ পেতেন। ২০১৯ সালে মায়ের মৃত্যুর পর যখন নিজের ইচ্ছার কথা বাবাকে জানান, তখন পরিবার থেকে আসে তীব্র আপত্তি। বাবার আসাম্মতির কারণে একসময় ঘর ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। মাসির বাড়ি হয়ে অবশেষে ঠাকুমার একচিলতে ঘরে আশ্রয় মেলে তাঁর। প্রথমদিকে ঠাকুমা মেনে নিতে না পারলেও, পরবর্তীতে আলিয়ার ইচ্ছাকেই জীবনের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব দেন তিনি।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা ও রূপান্তরের লড়াই

আলিয়ার এই উত্তরণে অনন্য ভূমিকা পালন করেছে ঝাড়গ্রামের ননীবালা বালিকা বিদ্যালয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকরা আলিয়াকে শুধু সাদরে গ্রহণই করেননি, বরং তিনি যাতে কোনও ধরনের উপহাস বা ট্রোলের শিকার না হন, সেদিকেও কড়া নজর রেখেছিলেন। সাধারণ ছাত্রীদের মতোই শাড়ি পরে বিদ্যালয়ে ক্লাস করেছেন আলিয়া, অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। সহপাঠীদের থেকেও পেয়েছেন পূর্ণ সহযোগিতা। ২০২৪ সালে মাধ্যমিক পাসের পর মনোবিদের পরামর্শ মেনে শুরু হয় তাঁর জেন্ডার ট্রানজিশনের চিকিৎসা। আইনিভাবে আদালতে অ্যাফিডেভিট করে অনুভবের নাম বদলে এখন তিনি আলিয়া।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও আর্থিক অনটনের মেঘ

দেশের প্রথম রূপান্তরকামী কলেজ অধ্যক্ষ মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়কে আদর্শ করে এগিয়ে চলা আলিয়ার ইচ্ছা এখন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসুয়াল আর্ট নিয়ে পড়াশোনা করার। ছোটবেলা থেকেই মাটি ও সিমেন্ট দিয়ে প্রতিমা গড়া এবং হস্তশিল্পে পারদর্শী আলিয়া বর্তমানে ছোটদের নাচ শিখিয়ে এবং নিজের দক্ষতায় নিজের খরচ চালান। তবে হরমোন থেরাপির ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং আগামী দিনের পড়াশোনার খরচ চালানো তাঁর ও তাঁর বৃদ্ধা ঠাকুমার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক অনটনের কারণে ভবিষ্যতে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে এই কৃতী পড়ুয়াকে।

পরিবারের চরম বিরোধিতা ও সামাজিক প্রতিকূলতাকে জয় করে আলিয়ার এই ঘুরে দাঁড়ানো সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সাহায্য করবে। তবে উপযুক্ত আর্থিক ও সামাজিক সহযোগিতা না পেলে তাঁর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন মাঝপথেই থমকে যেতে পারে, যা রূপান্তরকামী সমাজের মূল স্রোতে ফেরার লড়াইয়ে একটি বড় ধাক্কা হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *