সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার তেল-গ্যাস! বঙ্গোপসাগরে শুরু ভারতের সবচেয়ে বড় অভিযান

হরমুজ প্রণালীর চলমান সঙ্কট বিশ্বজুড়ে তেল ও এলপিজি সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে, যার সরাসরি আঁচ লেগেছে ভারতের বাজারেও। এই চরম বৈরী পরিস্থিতিতে বিদেশী শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্র। আত্মনির্ভর ভারত গড়ার লক্ষ্যে দেশের পূর্ব উপকূলে সমুদ্রের তলদেশে লুকিয়ে থাকা অজানা তেল ও গ্যাসের বিশাল ভাণ্ডার খুঁজে বের করতে একটি মেগা জরিপ অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে। গত ১৪ মে মোদী সরকার এই বিপুল কর্মযজ্ঞের জন্য আনুষ্ঠানিক টেন্ডার আহ্বান করেছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ হাইড্রোকার্বনস (DGH) আগামী দুই বছর ধরে এই বিস্তৃত সমীক্ষা চালাবে। মূল লক্ষ্য হলো বঙ্গোপসাগর, আন্দামান সাগর এবং দক্ষিণ ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলের গভীরে লুকিয়ে থাকা হাইড্রোকার্বনের সন্ধান পাওয়া। এর আগে নানা প্রযুক্তিগত ও ভৌগোলিক বাধার কারণে পূর্ব উপকূলে বড় মাপের সমুদ্রতল জরিপ করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সঙ্কট ভারতের নীতি নির্ধারকদের এই দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানে নামতে বাধ্য করেছে।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে সমুদ্রের মানচিত্র তৈরি
এই প্রকল্পের প্রযুক্তিগত নাম ‘টু-ডি ব্রডব্যান্ড মেরিন সিসমিক অ্যান্ড গ্র্যাভিটি-ম্যাগনেটিক ডাটা অ্যািশন, প্রসেসিং অ্যান্ড ইন্টারপ্রিটেশন’। এই প্রক্রিয়ায় বিশেষ যন্ত্রসজ্জিত বিশাল জাহাজ সমুদ্রের বুকে ‘স্ট্রিমার’ নামের দীর্ঘ তার টেনে নিয়ে চলবে। এই অত্যাধুনিক যন্ত্রটি সমুদ্রতলের গভীরে শক্তিশালী শব্দ-তরঙ্গ পাঠাবে, যা ভূগর্ভস্থ পাথরে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসবে। সেই প্রতিধ্বনির উন্নত ডেটা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রপৃষ্ঠের কয়েক কিলোমিটার গভীরের একটি নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করবেন, যা মূলত তেল ও গ্যাসের সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে।
পাঁচ অববাহিকায় ২ বছরের মেগা মিশন
দুই বছরের এই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে মোট ১.৬৭ লক্ষ লাইন কিলোমিটারেরও (LKM) বেশি এলাকায় জরিপ চালানো হবে। এর মধ্যে বঙ্গ-পূর্ণিয়া ও মহানদী অববাহিকায় ৪৫ হাজার, আন্দামান অববাহিকায় ৪৩ হাজার, কৃষ্ণা-গোদাবরী অববাহিকায় ৪৩ হাজার এবং কাবেরী অববাহিকায় ৩০ হাজার লাইন কিলোমিটার অঞ্চলে স্ক্যানিং করা হবে। বিজ্ঞানীদের মতে, বঙ্গীয় উপকূলের ১০ কিলোমিটার পুরু পাললিক স্তর, মহানদীর প্রাচীন হাইড্রোকার্বন ব্যবস্থা এবং আন্দামানের মিয়ানমার-ইন্দোনেশিয়া ঘেঁষা ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই অঞ্চলগুলোতে বিশাল গ্যাস ও মিথেন ভাণ্ডার পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষ্ণা-গোদাবরী ও কাবেরী অববাহিকার গভীর অঞ্চলেও নতুন জ্বালানি উৎসের ইঙ্গিত মিলেছে, যা আগামী দিনে ভারতের জ্বালানি অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
এক ঝলকে
- হরমুজ প্রণালীর সঙ্কটের জেরে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে বঙ্গোপসাগরসহ পূর্ব উপকূলে মেগা জরিপ শুরু করছে কেন্দ্র।
- ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ হাইড্রোকার্বনস (DGH) আগামী ২ বছরে ১.৬৭ লক্ষ লাইন কিলোমিটারেরও বেশি সমুদ্র এলাকায় এই স্ক্যানিং চালাবে।
- বিশেষ জাহাজের মাধ্যমে শব্দ-তরঙ্গ পাঠিয়ে সমুদ্রতলের কয়েক কিলোমিটার গভীরের মানচিত্র তৈরি করে তেল-গ্যাসের সন্ধান করা হবে।
- বঙ্গীয় উপকূল, আন্দামান, মহানদী, কৃষ্ণা-গোদাবরী ও কাবেরী— এই ৫টি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অববাহিকাকে এই অভিযানের মূল লক্ষ্য করা হয়েছে।