চ্যাটজিপিটির ধাক্কায় ধ্বংসের মুখে ১৫০০ কোটি ডলারের এডুটেক জায়ান্ট চেগ!

করোনা অতিমারির সময়ে অনলাইন শিক্ষার জোয়ারে ভেসে যে মার্কিন শিক্ষা-প্রযুক্তি (এডুটেক) সংস্থা আকাশছোঁয়া সাফল্য পেয়েছিল, কৃত্রিম মেধার (এআই) ঝড়ে মাত্র চার বছরেই সেই সাম্রাজ্য আজ ধ্বংসের মুখে। ২০২১ সালে প্রায় ১৫০০ কোটি ডলার বাজারমূল্য ছুঁয়ে ফেলা বিখ্যাত এডুটেক জায়ান্ট ‘চেগ’ এখন দেউলিয়া হওয়ার প্রান্তসীমায় এসে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তির ইতিহাসে জেনারেটিভ এআই-এর কারণে কোনো বড় কর্পোরেট সংস্থার এমন দ্রুত ও করুণ পতন সত্যিই নজিরবিহীন।
পতনের খতিয়ান ও শেয়ার বাজারে বিপর্যয়
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতেও চেগের প্রতিটি শেয়ারের দর ছিল ১১৩.৫ ডলার। ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকের তথ্য অনুযায়ী, সেই শেয়ারের দর নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ০.৯৯ ডলারে। অর্থাৎ, স্টকের মূল্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ পতন ঘটেছে। একসময়ের বিশাল এই সংস্থার বর্তমান বাজারমূল্য কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯ কোটি ডলারে। ২০২৫ সালের চতুর্থ ত্রৈমাসিকে সংস্থার আয় আগের বছরের তুলনায় ৪৯ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৭ কোটি ২৭ লক্ষ ডলারে ঠেকেছে। নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ম অনুযায়ী, একটানা ৩০টি কাজের দিন শেয়ারের দাম ১ ডলারের নীচে থাকলে বাজার থেকে বহিষ্কারের নোটিস দেওয়া হয়। চেগও ঠিক এমনই এক চরম সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
চ্যাটজিপিটির আগমন ও দ্বিমুখী লড়াই
চেগের মূল ব্যবসাই ছিল মাসিক ১৪.৯৫ থেকে ১৯.৯৫ ডলার সাবস্ক্রিপশনের বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্ক ও পাঠ্যবইয়ের জটিল প্রশ্নের ধাপে ধাপে সমাধান দেওয়া। কিন্তু ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি আসার পর শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যের এআই চ্যাটবটের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জটিল সমস্যার নিখুঁত উত্তর বিনামূল্যে মেলায় চেগের টাকা দিয়ে কেনা সাবস্ক্রিপশনের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। ২০২৩ সালের মে মাসে সংস্থার তৎকালীন সিইও ড্যান রোজনসওয়েগ প্রথম স্বীকার করেন যে, চ্যাটজিপিটির কারণে তাঁদের গ্রাহক সংখ্যা দ্রুত কমছে। এই আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তির পর মাত্র ২৪ ঘণ্টায় চেগের শেয়ারের দাম ৪৮ শতাংশ পড়ে যায় এবং ১০০ কোটি ডলারের বাজারমূল্য নিমেষে উধাও হয়ে যায়।
একই সাথে চেগকে লড়তে হচ্ছে সার্চ ইঞ্জিন গুগ্লের বিরুদ্ধেও। আগে শিক্ষার্থীরা গুগ্লে সার্চ করলে চেগের ওয়েবসাইটের লিঙ্ক আসত। কিন্তু গুগ্ল তার সার্চ ইঞ্জিনে এআই-এর মাধ্যমে সরাসরি উত্তর দেখানো শুরু করায় শিক্ষার্থীদের আর অন্য কোনো ওয়েবসাইটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না। চেগের অভিযোগ, গুগ্ল সার্চ পেজেই এআই সারসংক্ষেপ দেখিয়ে তাদের গ্রাহক ও ট্র্যাফিক চুরি করছে, যা কার্যত তাদের ব্যবসা বন্ধের কারণ। এই অভিযোগে চেগ সম্প্রতি গুগ্লের বিরুদ্ধে আইনি পথও বেছে নিয়েছে।
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও সম্ভাব্য প্রভাব
পরিস্থিতি সামাল দিতে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা সংস্থার সাথে হাত মিলিয়ে ‘চেগমেট’ নামের নিজস্ব এআই চ্যাটবট তৈরি কিংবা সম্পূর্ণ এআই-নির্ভর লার্নিং প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের চেষ্টা করেছিল চেগ। তবে তত দিনে শিক্ষার্থীরা চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো বিনামূল্যের এআই প্ল্যাটফর্মে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে গত কয়েক বছরে চেগ তাদের আন্তর্জাতিক অফিসগুলো বন্ধ করে দিয়েছে এবং প্রায় ৪৫ থেকে ৬৭ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে।
চেগের এই পরিণতি প্রমাণ করে দিল যে, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (এলএলএম) তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়ার ক্ষমতা মানুষের তৈরি যেকোনো বিশাল তথ্যভান্ডারের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সাশ্রয়ী। চেগের তৈরি করা কোটি কোটি ডলারের ডেটাবেসও শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম মেধার এই জোয়ারকে রুখতে পারল না।