সমুদ্র সৈকতে পথচারীর ম্যাজিক সিপিআর, মৃত্যুর মুখ থেকে তরুণকে ফিরিয়ে নবজীবন দিল রুবি হাসপাতাল

সমুদ্র সৈকতে পথচারীর ম্যাজিক সিপিআর, মৃত্যুর মুখ থেকে তরুণকে ফিরিয়ে নবজীবন দিল রুবি হাসপাতাল

গ্রীষ্মের ছুটি কিংবা উইকএন্ডের সুযোগ পেলেই বাঙালি দিঘা, মন্দারমণি বা তাজপুরের সমুদ্র সৈকতে ছুটে যায়। কিন্তু অসাবধানতা বা সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ যেকোনো মুহূর্তে ডেকে আনতে পারে মারাত্মক বিপদ। সম্প্রতি তালসারিতে সমুদ্রে স্নান করতে নেমে এক অভিনেতার মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই মন্দারমণিতে ঘটে গেল এক ভীতিপ্রদ ঘটনা। সমুদ্রে তলিয়ে গিয়ে প্রায় মৃত্যুর মুখে পৌঁছে যাওয়া ২৯ বছর বয়সী এক যুবককে শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। সমুদ্র সৈকতে উপস্থিত এক সাধারণ পথচারীর তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা, সঠিক ‘সিপিআর’ (Cardiopulmonary Resuscitation) এবং কলকাতার রুবি জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টায় নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন ওই তরুণ।

সৈকতে দেবদূতের আগমন ও প্রাথমিক লড়াই

মন্দারমণির সমুদ্রে স্নান করতে নেমে আচমকাই তলিয়ে যান ওই যুবক। জল থেকে যখন তাঁকে সৈকতে উদ্ধার করে আনা হয়, ততক্ষণে তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস প্রায় বন্ধ। ঠিক সেই সংকটজনক মুহূর্তে দেবদূতের মতো এগিয়ে আসেন সেখানে উপস্থিত এক পথচারী। তিনি কালবিলম্ব না করে যুবকের বুকে চাপ দিয়ে ‘সিপিআর’ দেওয়া শুরু করেন। এই প্রাথমিক চিকিৎসার ফলেই যুবকের শরীরে কৃত্রিমভাবে রক্তসঞ্চালন ও ফুসফুসে কিছুটা অক্সিজেন পৌঁছানো সম্ভব হয়, যা প্রাথমিক অবস্থায় শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া রুখে দেয়। এরপর তাঁকে স্থানীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়ে একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে ভেন্টিলেশনে দেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিবার তাঁকে কলকাতার রুবি জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তরিত করে।

রুবি হাসপাতালে জটিল চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের জয়

রুবি হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে যখন যুবককে আনা হয়, তখন তিনি সম্পূর্ণ অচেতন, রক্তচাপ মারাত্মকভাবে কম এবং শরীরের কোষে অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শূন্যের কোঠায়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে রোগীকে হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সৌরভ ধাড়ার তত্ত্বাবধানে আইসিইউ-তে ভর্তি করা হয়। জলে ডোবার কারণে যুবকের ফুসফুস সম্পূর্ণ নোনা জলে ভরে গিয়েছিল এবং অক্সিজেনের চরম ঘাটতিতে তাঁর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছিল। নোনা জল ঢোকায় ফুসফুসের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে হার্ট ও মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয়।

পরীক্ষায় দেখা যায়, অক্সিজেনের অভাবে যুবকের মস্তিষ্কে মারাত্মক ফোলা ভাব বা ‘সেরিব্রাল এডিমা’ তৈরি হয়েছে। মস্তিষ্কের ক্ষতি আটকাতে চিকিৎসকেরা তাঁকে টানা দুদিন কৃত্রিম উপায়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখেন। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টায় তৃতীয় দিনে যুবকের অবস্থার উন্নতি হলে ভেন্টিলেশন খোলা হয়। তবে অক্সিজেনের অভাবজনিত ট্রমার কারণে যুবকের মধ্যে সাময়িক মানসিক বিভ্রান্তি বা ‘ডেলিরিয়াম’ দেখা দিলেও তা ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পরবর্তীতে রক্তের রিপোর্টে ‘অ্যাসিনেটোব্যাক্টর’ নামক বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ মিললেও সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে চিকিৎসকেরা তা সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলেন। টানা এক সপ্তাহের যমে-মানুষের লড়াইয়ের পর সমস্ত শারীরিক প্যারামিটার স্বাভাবিক হওয়ায় যুবকটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের ‘সিপিআর’ বা আপদকালীন প্রাথমিক চিকিৎসা জানা কতটা জরুরি, যা সঠিক সময়ে প্রয়োগ করলে একটি প্রাণ বেঁচে যেতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *