বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ রূপ, সাড়ে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যুতে কাঠগড়ায় টিকাকরণ কর্মসূচি

বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ রূপ, সাড়ে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যুতে কাঠগড়ায় টিকাকরণ কর্মসূচি

বাংলাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের প্রকোপ। মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া এই ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে ইতিমধ্যেই ৪৫১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এত বিপুলসংখ্যক শিশুর প্রাণহানি দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করেছে। শেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ১২ জন শিশুর মৃত্যুর খবর মিলেছে, যাদের মধ্যে চারজনের শরীরে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং বাকি আটজন হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।

স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের প্রকোপ দৃশ্যমান হতে শুরু করে। এ পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার ৬১১ জন শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ৭ হাজার ৪১৬ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৪০ হাজার ১৭৬ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে ৩৬ হাজার ৫৫ জন শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, বরিশাল, ময়মনসিংহ এবং সিলেট অঞ্চলে এই রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।

ব্যর্থ টিকাকরণ ও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের সংকট

দেশের চিকিৎসক সংগঠনগুলো এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের চরম গাফিলতি ও উদাসীনতাকে দায়ী করেছে। চিকিৎসকদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের সার্বিক টিকাকরণ কর্মসূচি স্থবির হয়ে পড়ে এবং বিষয়টিকে অত্যন্ত হালকাভাবে নেওয়া হয়। সাধারণত ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুরা হামের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। সঠিক সময়ে শিশুদের বুস্টার ডোজ ও নিয়মিত টিকা না দেওয়ায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়েছে। এর পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে শিশুদের নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো বন্ধ করে দেওয়াকে এই মরণব্যাধির ভয়াল রূপ ধারণ করার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বাংলাদেশ চিকিৎসক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ডা. এমএইচ ফারুকী।

জনস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের শঙ্কা

বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাকরণ ও জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে এমন বড় ধরনের বিপর্যয় দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত শিশুর মৃত্যু স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল সমন্বয় ও নজরদারির অভাবকে স্পষ্ট করে তোলে। জরুরি ভিত্তিতে সারা দেশে বিশেষ টিকাকরণ ক্যাম্পেইন শুরু করা এবং ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ স্বাভাবিক না করা হলে এই মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক শিশুমৃত্যুর হার কমানোর লক্ষ্যমাত্রাকে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *