ভারতের শিশু মৃত্যু হারে নজিরবিহীন পতন, কিন্তু রাজ্যগুলির বৈষম্য কি কাটবে?

ভারতের শিশু মৃত্যু হারে নজিরবিহীন পতন, কিন্তু রাজ্যগুলির বৈষম্য কি কাটবে?

ভারতে শিশু মৃত্যু হার (আইএমআর) কমানোর ক্ষেত্রে এক বড়সড় সাফল্য এসেছে। স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের (এসআরএস) সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে প্রতি হাজার জীবিত শিশু জন্মে মৃত্যু হার যেখানে ৩০ ছিল, তা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ২৪-এ নেমে এসেছে। স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি এবং নবজাতকদের সঠিক দেখভালের কারণেই প্রতি বছর গড়ে প্রায় এক পয়েন্ট করে এই পতন সম্ভব হয়েছে। সামগ্রিকভাবে গত এক দশকে ভারত তার শিশু মৃত্যু হার ৩৭.৪ শতাংশ কমাতে পেরেছে, যা আগের দশকের তুলনায় অনেকটাই আশাব্যঞ্জক। তবে এই জাতীয় সাফল্যের আড়ালেও রাজ্যগুলির ভেতরের বিশাল সামাজিক ও পরিকাঠামো গত বৈষম্য রয়েই গেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের সুফল ও আঞ্চলিক বৈষম্য

এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো হাসপাতালে বা চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রসবের (প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব) হার বৃদ্ধি। ২০১৯ সালে যেখানে মাত্র ৮৩ শতাংশের কম প্রসব হাসপাতালে হতো, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এই দশকে সবচেয়ে চমৎকার পারফরম্যান্স দেখিয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর, যেখানে শিশু মৃত্যু হার ৬২.৭ শতাংশ কমে ৩৭ থেকে ১৪-তে নেমে এসেছে। এর বিপরীতে কেরালা মাত্র ৮টি মৃত্যু হার নিয়ে দেশের মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান ধরে রেখেছে। তবে আশঙ্কার কথা হলো, ছত্তিশগড়ে এই হার দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৬, যার ঠিক পেছনেই রয়েছে উত্তর প্রদেশ ও মধ্য প্রদেশ (৩৫)। ছত্তিশগড়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব ৭৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৭ শতাংশ হলেও মৃত্যু হার আশানুরূপ না কমা প্রমাণ করে যে, কেবল হাসপাতালে প্রসব বাড়ানোই শেষ কথা নয়, প্রসব-পরবর্তী উন্নত চিকিৎসার অভাবও অন্যতম কারণ।

লিঙ্গবৈষম্য ও নবজাতকদের বাঁচার লড়াই

শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় শিশু মৃত্যু হার কমার গতি (৩৬ শতাংশ) সামান্য বেশি হলেও গ্রামীণ ভারতের বাস্তব চিত্র এখনও উদ্বেগের। আজকেও দেশের গ্রামীণ এলাকায় প্রতি ৩৭ জন শিশুর মধ্যে ১ জন এবং শহরাঞ্চলে প্রতি ৫৯ জনের মধ্যে ১ জন শিশু তাদের জীবনের প্রথম বছরটি পার করার আগেই মারা যায়। এর পাশাপাশি বিহারের মতো বড় রাজ্যগুলিতে কন্যাসন্তানদের প্রতি অবহেলা ও পুষ্টিহীনতার কারণে জেন্ডার গ্যাপ বা লিঙ্গবৈষম্য স্পষ্ট, যেখানে ছেলেদের মৃত্যু হার ২১ হলে মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ২৫। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে ‘নবজাতক মৃত্যু হার’ (এনএমআর), যা শিশুর জন্মের প্রথম ২৮ দিনের ভেতরের মৃত্যুকে বোঝায়। বর্তমানে দেশের মোট শিশু মৃত্যুর প্রায় ৭৩ শতাংশই ঘটে এই প্রাথমিক দিনগুলিতে, যা ২০১৪ সালের (৬৭.৬ শতাংশ) তুলনায় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

এক ঝলকে

  • ভারতের শিশু মৃত্যু হার (আইএমআর) ২০১৯ সালের ৩০ থেকে কমে বর্তমানে ২৪-এ দাঁড়িয়েছে।
  • কেরালায় শিশু মৃত্যু হার দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম (৮), অন্যদিকে ছত্তিশগড়ে এই হার সবচেয়ে বেশি (৩৬)।
  • দেশে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বেড়ে ৯৫ শতাংশের বেশি হলেও মোট শিশু মৃত্যুর ৭৩ শতাংশই ঘটে জন্মের প্রথম ২৮ দিনের মধ্যে।
  • জম্মু ও কাশ্মীর শিশু মৃত্যু হার ৬২.৭ শতাংশ কমিয়ে সেরা সাফল্য দেখিয়েছে, অন্যদিকে বিহারে কন্যাসন্তানদের মৃত্যু হার ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *