ইরানকে ইজরায়েলপন্থী করার কঠিন শর্ত ট্রাম্পের, মধ্যস্থতা করতে গিয়ে মহাসংকটে পাকিস্তান

ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার চলমান যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় এক নাটকীয় মোড় এসেছে। দুই দেশের সরাসরি আলোচনার কোনো পথ না থাকায় পাকিস্তান এখানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক নয়া শর্তের কারণে এখন চরম কূটনৈতিক সংকটে পড়েছে ইসলামাবাদ। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’-কে হাতিয়ার করে ইরান ও অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোকে ইজরায়েলপন্থী করার এই শর্ত পাকিস্তানের জন্য কার্যত ‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের বিষয়ে ইরান সম্মতি জানানোর পর মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও আভাস দিয়েছিলেন যে, দ্রুতই একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার জটিলতা আরও ঘনীভূত হয়েছে। পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইরানের বাজেয়াপ্ত হওয়া সম্পদ ফেরাতে মার্কিন প্রশাসন অস্বীকৃতি জানানোয় ক্ষুব্ধ হয়েছে তেহরান। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই শর্ত পূরণ না হলে কোনো আলোচনা হবে না। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে শান্তিচুক্তি নিয়ে তাঁর কোনো তাড়া নেই। বরং তিনি মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বকে ফোনে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, যুদ্ধ থামাতে হলে আরও বেশি মুসলিম দেশকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডে শামিল করতে হবে, যার পরোক্ষ লক্ষ্য ইরানকে ইজরায়েলের মুখোমুখি বসানো।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডের চাপ ও পাকিস্তানের উভয়সংকট
২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ও ইজরায়েলের মধ্যে কয়েক দশকের বৈরিতা দূর হয়েছিল এবং ইজরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্পের বর্তমান কৌশল হলো এই চুক্তির পরিধি আরও বাড়িয়ে ইরান ও পাকিস্তানকে এর আওতায় আনা। কিন্তু দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে পাকিস্তানের পক্ষে এই শর্ত মানা বা ইরানকে এতে রাজি করানো প্রায় আসাম্ভব।
মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে পাকিস্তান ও ইরান বরাবরই প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ হলো প্যালেস্টাইনের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। অতীতে মার্কিন চাপ থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এই চুক্তিতে যোগ দেননি। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই শর্ত মেনে নিলে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিজ দেশেই প্রবল জনরোষের মুখে পড়তে হবে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় সম্ভাব্য প্রভাব
ট্রাম্পের এই অনমনীয় শর্তের কারণে মধ্যপ্রাচ্যসহ সামগ্রিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। ইরান যদি এই মার্কিন চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে, তবে যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা আরও পিছিয়ে যাবে। অন্যদিকে, আমেরিকার শর্তপূরণ এবং ইরানের ক্ষোভ প্রশমনের কোনো মাঝামাঝি পথ বের করতে না পারলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বড়সড় ধাক্কা খাবে। ফলস্বরূপ, এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের বাজারের স্থিতিশীলতা পুনরায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছে।