হরমুজে মার্কিন স্ট্রাইকের পর কি আরও ঘনীভূত হবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধমেঘ!

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে উত্তেজনা এক নতুন মাত্রা নিল। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর আকাশে ৪টি ইরানি ড্রোন ধ্বংস করার পর, এবার সরাসরি ইরানের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ‘প্রতিরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যখন একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই আমেরিকার এই আকস্মিক সামরিক পদক্ষেপ পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মার্কিন প্রশাসনের একাধিক সূত্র মারফত জানা গেছে, হরমুজ প্রণালীর আশপাশে উড়তে থাকা ইরানের ৪টি ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন’ আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং মার্কিন বাহিনীর জন্য সম্ভাব্য হুমকি হয়ে উঠছিল। ফলে সেগুলিকে আকাশেই নিকেশ করা হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরপরই ইরানের বন্দর আব্বাসের একটি স্থল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রকে নিশানা করে মার্কিন বাহিনী হামলা চালায়, যেখান থেকে পঞ্চম ড্রোনটি ওড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। চলতি সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার এটি দ্বিতীয় ‘প্রতিরক্ষামূলক হামলা’।
অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও পরমাণু চুক্তির টানাপোড়েন
এই সামরিক সংঘাতের আবহে ইরানের অর্থনীতি নিয়ে অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে তিনি দাবি করেছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ মূল্যবৃদ্ধির হার ২৫০ শতাংশে পৌঁছেছে এবং সে দেশের মুদ্রার বাজারদর কার্যত তলানিতে ঠেকেছে। ট্রাম্পের মতে, সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া একটি অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে ইরান এখন কার্যত বাধ্য হয়ে আলোচনার টেবিলে বসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিশ্বশান্তির স্বার্থেই ইরানকে কোনোভাবেই পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
যদিও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে, তবুও মূল দ্বন্দ্ব কাটেনি। ইরান এই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করে তা কার হাতে তুলে দেবে, তা নিয়ে আমেরিকার উদ্বেগ অপরিসীম। ওয়াশিংটন কোনোভাবেই চায় না এই প্রক্রিয়ায় রাশিয়া বা চিনের মতো পরাশক্তিগুলো লাভবান হোক।
বিশ্ব বাণিজ্য ও হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ
বিশ্বের জ্বালানি ও পণ্য পরিবহণের অন্যতম প্রধান ধমনী হলো হরমুজ প্রণালী। এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমেরিকা যে কোনো স্তরে যেতে প্রস্তুত, তা এই হামলার মাধ্যমে স্পষ্ট। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, এই আন্তর্জাতিক জলপথ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং কোনো একক দেশ এর ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারবে না।
এই হামলার ফলে সাময়িকভাবে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনা বড়সড় ধাক্কা খেল। একদিকে আলোচনার টেবিলে সমঝোতার চেষ্টা, অন্যদিকে সরাসরি সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত—আমেরিকার এই দ্বিমুখী কৌশল মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে সৃষ্ট এই অস্থিরতা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ লাইনে নতুন করে সংকট তৈরির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিল।