মানবিকতার অনন্য নজির, দিল্লির অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসার লোকসান ভুলে দেবদূত রিয়াজুদ্দিন ও আরমান

দক্ষিণ দিল্লির মালব্য নগরের হৌজ রানি এলাকার একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এক চরম মানবিকতার নজির সৃষ্টি হয়েছে। ‘ফ্লারিশ স্টে’ হোটেলের উল্টোদিকে থাকা একটি গদির দোকানের মালিক রিয়াজুদ্দিন মনসুরি এবং তাঁর ছেলে আরমান নিজেদের ব্যবসার বিপুল ক্ষতির তোয়াক্কা না করে বিপন্ন মানুষের প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জ্বলন্ত হোটেলের দোতলা থেকে প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে লাফিয়ে পড়া আবাসিকদের রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে তাঁদের দোকানের নতুন গদি ও কম্বল।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও হোটেলের গাফিলতি
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, শর্ট সার্কিট থেকেই দিল্লির ওই হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। পরিস্থিতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে হোটেলের ভেতরে থাকা ঠাসা গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে, যা কার্যত মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়েছিল। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, হোটেলটির কোনো ‘ফায়ার এনওসি’ বা অগ্নিনির্বাপণ সংক্রান্ত বৈধ ছাড়পত্র ছিল না। কোনো রকম সুরক্ষা বিধি না মেনেই এই মারণফাঁদ চালানো হচ্ছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি আধিকারিকদের একাংশের ঘুষের বিনিময়ে এই ধরণের বেআইনি হোটেল চালানোর অনুমতি দেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসছে।
প্রাণ বাঁচাতে দু’লাখের লোকসান তুচ্ছ
বুধবারের সেই অভিশপ্ত সকালে যখন হোটেলের গ্রাউন্ড ফ্লোর দাউদাউ করে জ্বলছিল, তখন ওপরের তলার আবাসিকদের বাঁচার একমাত্র পথ ছিল জানলা দিয়ে ঝাঁপ দেওয়া। পাথুরে রাস্তায় পড়ে যাতে কারও প্রাণ না যায়, তার জন্য রিয়াজুদ্দিন ও আরমান নিজেদের দোকান থেকে প্রায় ২০ থেকে ২২টি নতুন গদি, কম্বল এবং চাদর এনে রাস্তায় বিছিয়ে দেন। প্রায় দু’লক্ষ টাকার নতুন মাল নিমেষের মধ্যে রাস্তায় বিলিয়ে দিতে তাঁরা দ্বিধা করেননি। আরমানের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই মুহূর্তে হিন্দু বা মুসলিম পরিচয় বড় ছিল না, বিপদে পড়া ভারতীয়দের বাঁচানোই ছিল তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য।
ক্ষতিপূরণ ও গণ-তহবিলের দাবি
এই নিঃস্বার্থ অবদানের কথা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে প্রশংসার ঝড় উঠেছে। নেটিজেনরা একযোগে দাবি তুলেছেন, রিয়াজুদ্দিনের এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে সরকারের উচিত তাঁকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে সম্মানিত করা। পাশাপাশি, এই মহৎ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে একটি গণ-তহবিল বা ‘ফান্ডরাইজার’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে অনেকেই আর্থিক অবদান রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, নিয়মনীতি লঙ্ঘনকারী হোটেল কর্তৃপক্ষ এবং জড়িত দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের কঠোর শাস্তির দাবি জোরালো হচ্ছে।