২৮ হাজার ফুটে মুখে ঘুষি আর মৃতদেহের টাকা লোপাট! এবার ‘এভারেস্ট দুর্নীতি’র নিশানায় অরূপ বিশ্বাস

২৮ হাজার ফুটে মুখে ঘুষি আর মৃতদেহের টাকা লোপাট! এবার ‘এভারেস্ট দুর্নীতি’র নিশানায় অরূপ বিশ্বাস

রাজ্যে শিক্ষা, বালি বা কয়লা দুর্নীতির খবরের মাঝেই এবার প্রকাশ্যে এল এক চাঞ্চল্যকর এবং অমানবিক ‘এভারেস্ট দুর্নীতি’। চন্দননগরের মেয়ে তথা মাউন্ট এভারেস্ট জয়ী স্বনামধন্য পর্বতারোহী পিয়ালী বসাক রাজ্যের তৎকালীন যুবকল্যাণ ও ক্রীড়া মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং তাঁর তৈরি করা কমিটির বিরুদ্ধে যে মারাত্মক অভিযোগ এনেছেন, তা আক্ষরিক অর্থেই হাড়হিম করা।

পিয়ালী বসাকের মূল অভিযোগগুলো কী কী?

টিভি ৯ বাংলাকে দেওয়া একটি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে পিয়ালী যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, তা এক ভয়াবহ দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রের দিকে ইঙ্গিত করে—

  • নিম্নমানের সরঞ্জাম ও মর্মান্তিক পরিণতি: ২০১৮ সালে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত একটি অভিযানে ১০ জন যুবককে পাঠানো হয়েছিল। অভিযোগ, সরকারের তরফ থেকে অত্যন্ত নিম্নমানের তাঁবু ও স্লিপিং ব্যাগ দেওয়া হয়। এর ফলে মাত্র ২১ হাজার ফুট উচ্চতায় ৫ জন পর্বতারোহী ফ্রস্ট বাইটের শিকার হন এবং তাঁদের হাত-পায়ের সমস্ত আঙুল কেটে বাদ দিতে হয়।
  • মৃতদেহ উদ্ধারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ: ছন্দা গায়েন, দীপঙ্কর ঘোষ বা গৌতম ঘোষের মতো যে সমস্ত পর্বতারোহীরা পাহাড়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাঁদের মৃতদেহ উদ্ধারের জন্য রাজ্য সরকার মাথা পিছু ২ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল। কিন্তু নেপালের সংশ্লিষ্ট এজেন্সি সেই টাকা পায়নি বলে পিয়ালী জানান। এই বিপুল অঙ্কের টাকা কোথায় গেল, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
  • ২৮ হাজার ফুট উচ্চতায় প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্র: ২০১৯ সালের এভারেস্ট সামিটের সময় পিয়ালীর অভিযান রুখতে কমিটির একাংশ তাঁর শেরপাকে বিপুল টাকার ঘুষ দিয়েছিল বলে অভিযোগ। এর জেরে ২৮ হাজার ফুট উচ্চতায় চরম প্রতিকূল পরিবেশে ওই শেরপা পিয়ালীর মুখে ঘুষি মারে এবং তাঁর সরঞ্জাম বিদেশিদের দিয়ে দেয়। তা সত্ত্বেও পিয়ালী দমে না গিয়ে এভারেস্ট জয় করেন।
  • মন্ত্রীর অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহার: এই পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির কথা তৎকালীন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে জানাতে গেলে তিনি পিয়ালীর কোনো কথাই শোনেননি। উল্টে নিজের নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে পিয়ালীকে নিউ সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন বলে অভিযোগ।

সংবাদ বিশ্লেষণ এবং এই ঘটনার তাৎপর্য

পিয়ালী বসাকের এই বিস্ফোরক বয়ান শুধুমাত্র আর্থিক দুর্নীতির দিকে আঙুল তুলছে না, বরং এটি মানবতা ও প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতার এক চরম রূপকে সামনে নিয়ে এসেছে।

১. দুর্নীতির অমানবিক মাত্রা

সাধারণত দুর্নীতি বলতে আমরা আর্থিক তছরুপ বুঝি। কিন্তু পাহাড়ে ওঠা পর্বতারোহীদের নিম্নমানের সরঞ্জাম দেওয়া মানে সরাসরি তাঁদের জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়া। ৫ জন যুবকের আঙুল বাদ যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, কাটমানি বা দুর্নীতির স্বার্থে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতেও পিছপা হয়নি তৎকালীন প্রশাসন।

২. ক্রীড়া ও অ্যাডভেঞ্চার জগতে মাফিয়া রাজ

রাজ্যের যুবকল্যাণ দপ্তরের অধীনে তৈরি হওয়া কমিটিতে (যেখানে দেবদাস নন্দী, সত্যরূপ সিদ্ধান্তদের মতো নাম রয়েছে) যেভাবে দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে, তা ক্রীড়া জগতে চরম অস্বচ্ছতার ইঙ্গিত দেয়। একজন সফল পর্বতারোহীকে ২৮ হাজার ফুট ওপরে শারীরিক নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে, এটি স্পোর্টস স্পিরিটের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং একটি মাফিয়া সুলভ আচরণ।

৩. মৃতদের নিয়েও বাণিজ্য

যাঁরা রাজ্যের নাম উজ্জ্বল করতে গিয়ে প্রাণ হারালেন, তাঁদের মৃতদেহ উদ্ধারের টাকাও লোপাট হয়ে যাওয়ার অভিযোগটি এই গোটা পর্বের সবচেয়ে লজ্জাজনক দিক। এটি প্রশাসনিক স্তরে চরম অসংবেদনশীলতা এবং দুর্নীতির শিকড় কতটা গভীরে পৌঁছেছিল, তার প্রমাণ দেয়।

৪. শীর্ষ স্তরের দায়বদ্ধতা

অরূপ বিশ্বাসের মতো একজন দাপুটে মন্ত্রীর দিকে সরাসরি আঙুল ওঠায় এটি স্পষ্ট যে, এই দুর্নীতি নিচুতলায় সীমাবদ্ধ ছিল না। অভিযোগ শোনার বদলে অভিযোগকারীকে বের করে দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই চক্রকে উপর মহল থেকেই প্রশ্রয় দেওয়া হতো।

উপসংহার

রাজ্যে পালাবদলের পর একের পর এক দুর্নীতির যে পর্দাফাঁস হচ্ছে, পিয়ালী বসাকের এই ‘এভারেস্ট দুর্নীতি’র অভিযোগ তার মধ্যে অন্যতম চাঞ্চল্যকর। এই ঘটনা শুধু একটি আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়, বরং রাজ্যের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দপ্তরের একটি অন্ধকার এবং অমানবিক অধ্যায়কে জনসমক্ষে নিয়ে এল। এই অভিযোগের পর আইনি পদক্ষেপ কী হয়, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *