দল ভেঙে যাওয়ার পরেও যেভাবে ইতিহাস গড়েছিলেন ইন্দিরা!

দল ভেঙে যাওয়ার পরেও যেভাবে ইতিহাস গড়েছিলেন ইন্দিরা!

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে বর্তমান টালমাটাল পরিস্থিতি এবং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া জল্পনা ভারতীয় রাজনীতির পুরনো একটি অধ্যায়কে সামনে নিয়ে এসেছে। অতীতে দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও নিজের দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে এবং চরম রাজনৈতিক সঙ্কটের মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

১৯৬৯ সালে প্রথম ধাক্কা ও জনসমর্থনের বিজয়

১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের জেরে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর সরাসরি সঙ্ঘাত শুরু হয়। নীলম সঞ্জীব রেড্ডির পরিবর্তে তিনি ভি ভি গিরিকে সমর্থন করায় তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি এস নিজালিঙ্গাপ্পা তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। এই বিবাদের মূল কারণ ছিল দলের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গির অমিল। দল ভেঙে দু’ভাগ হয়ে গেলেও ইন্দিরা গান্ধী পিছুপা হননি। তিনি ১৪টি বড় ব্যাংক জাতীয়করণের মতো সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি পৌঁছান। যার প্রভাব পড়েছিল ১৯৭১ সালের লোকসভা নির্বাচনে, ‘গরিবি হটাও’ স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি বিপুল জনসমর্থন আদায় করে একক শক্তিতে ক্ষমতায় ফিরে আসেন।

জরুরি অবস্থার বিপর্যয় ও নতুন দলের উত্থান

১৯৭৭ সালের জরুরি অবস্থার পর নির্বাচনে ঐতিহাসিক পরাজয়ের মুখোমুখি হন ইন্দিরা গান্ধী। জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসার পর দলের একাংশ তাঁকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে এবং বহু পুরনো সহযোগী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার এই তীব্র সঙ্কটের মধ্যেও তিনি মনোবল হারাননি। বিহারের বেলচিতে দলিত নিগ্রহের ঘটনাস্থলে হাতির পিঠে চড়ে তাঁর ছুটে যাওয়া সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে, যা তাঁর ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। ১৯৭৮ সালে তাঁকে পুনরায় দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তিনি ‘কংগ্রেস (আই)’ গঠন করেন। এই বিশাল রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়ার মাত্র দুই বছরের মাথায়, ১৯৮০ সালের নির্বাচনে তিনি পুনরায় দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মসনদে বসেন।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেস এবং সেই সময়ের কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবে ইতিহাস থেকে যে বার্তাটি স্পষ্ট হয়, তা হলো কোনো জনপ্রিয় নেতার হাত থেকে দলীয় সংগঠন সাময়িকভাবে হাতছাড়া হলেও যদি সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহানুভূতি থাকে, তবে প্রত্যাবর্তনের পথ রুদ্ধ হয় না। দল থেকে বহিষ্কৃত বা কোণঠাসা হয়েও ইন্দিরা গান্ধী যেভাবে দু’বার অপ্রতিরোধ্য গতিতে ফিরে এসেছিলেন, তা বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সমীকরণেও এক গভীর তাৎপর্য বহন করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *