এক ছাতার তলায় ৫৫ প্রকল্পের সুবিধা! নন্দীগ্রাম থেকে কী বার্তা দিলেন শুভেন্দু অধিকারী?

দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে নাগরিক পরিষেবা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে এক অভিনব উদ্যোগ শুরু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যের বিজেপি সরকার গঠনের পঞ্চম সপ্তাহেই শুরু হলো ত্রিদিবসী ‘জনকল্যাণ শিবির’। সোমবার নন্দীগ্রামের রেয়াপাড়া থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই মেগা কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। আগামী ১৭ জুন পর্যন্ত রাজ্যের প্রায় ১১০০টি স্থানে এই প্রশাসনিক শিবির চলবে, যেখান থেকে সাধারণ মানুষ ৫৫টি জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের সুবিধা সরাসরি লাভ করতে পারবেন।
দুর্নীতিমুক্ত পরিষেবা ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়াস
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই শিবিরের মূল লক্ষ্য তিনটি— নাগরিকদের কাছে সরাসরি সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং একই ছাদের তলায় ফর্ম পূরণ থেকে শুরু করে নথি যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা। এর মাধ্যমে অন্নপূর্ণা যোজনা, যুবশক্তি প্রকল্প, পিএম কিসান, বার্ধক্য ও বিধবা ভাতার মতো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলির সুবিধা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আসবে। একই সাথে ভোটার ও অন্যান্য পরিচয়পত্রের ভুল সংশোধনেরও সুযোগ থাকছে এখানে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই কর্মসূচির গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে লক্ষ্মীর ভান্ডারসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ভুয়ো অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের দৌরাত্ম্য রুখে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে প্রকৃত প্রাপকদের কাছে সুবিধা পৌঁছে দেওয়া। এই শিবির থেকেই তিনি ঘোষণা করেন, ১২৫ দিনের কাজের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার এই মাসেই ৭০০ কোটি টাকা দিয়েছে এবং মোট বরাদ্দ হয়েছে ৮৫০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি ৭৯ লক্ষ মহিলাকে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে ৩০০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে এবং আগামী ২০ জুলাই থেকে আবাস যোজনার সমীক্ষা শুরু হবে।
প্রথম দিনেই সমন্বয়ের অভাব ও অব্যবস্থার ছবি
উদ্যোগটি অত্যন্ত ইতিবাচক হলেও কর্মসূচির প্রথম দিনেই রাজ্যের বেশ কিছু জায়গায় চরম অব্যবস্থার চিত্র সামনে এসেছে, যা প্রশাসনের অন্দরে সমন্বয়ের অভাবকে স্পষ্ট করে তুলেছে। পুরুলিয়ার এমএসএ ইন্ডোর স্টেডিয়াম ও পুরুলিয়া-১ ব্লকের শিবিরে তীব্র গরম উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ লাইনে দাঁড়ালেও পর্যাপ্ত ফর্ম না পেয়ে ক্ষোভ উগরে দেন। অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রক্রিয়ার সঠিক তথ্য না পাওয়ায় সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়।
অন্যদিকে, উত্তরপাড়ার মণীন্দ্র ভবনের শিবিরে পানীয় জলের ন্যূনতম ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তী এই ঘটনার পেছনে উত্তরপাড়া পুরসভার পুরপ্রধান ও এগ্জ়িকিউটিভ অফিসারের পরিকল্পিত ‘অন্তর্ঘাত’ রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন। এই অব্যবস্থার বিষয়টি তিনি খোদ মুখ্যমন্ত্রী ও বিভাগীয় মন্ত্রীর নজরে আনার কথা জানিয়েছেন।
সম্ভাব্য প্রভাব
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জনকল্যাণ শিবির নতুন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। যদি এই শিবিরের মাধ্যমে গ্রামীণ ও প্রান্তিক স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়, তবে তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা নেবে। তবে প্রথম দিনের অব্যবস্থা ও রাজনৈতিক বিরোধের জেরে পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা দ্রুত রোধ করা না গেলে এই বৃহৎ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।