সরকারি পদ সামলে বেসরকারি কলেজের চেয়ারপার্সন! বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোর্টস অফিসারের কীর্তিতে তীব্র বিতর্ক

সরকারি চাকরি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদে থেকে কি সমান্তরালভাবে কোনো লাভজনক বেসরকারি সংস্থা বা ট্রাস্ট পরিচালনা করা যায়? এই বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়ে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে রাজ্যের শিক্ষামহলে। কাঠগড়ায় বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান স্পোর্টস অফিসার সুরজিৎ নন্দী। বিশ্ববিদ্যালয়ের কঠোর নিয়মাবলীকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একাধারে সরকারি বেতনভুক উচ্চপদস্থ আধিকারিক এবং অন্যদিকে একটি বেসরকারি বিএড কলেজের ফাউন্ডার বডির চেয়ারপার্সন পদে তাঁর থাকার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
বাঁকুড়ার বেসরকারি বিএড কলেজ ও পারিবারিক যোগসূত্র
can ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০১৭ সালে বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর সংলগ্ন সুখঝোড়া এলাকায় তৈরি হওয়া একটি বেসরকারি বিএড কলেজ। ‘মহাদেব ট্রাস্ট’-এর অধীনে থাকা ‘মহাভাস্কর টিচার্স ট্রেনিং কলেজ’ নামের ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সরকারি নথি খতিয়ে দেখে এক বিস্ফোরক তথ্য মিলেছে। দেখা গিয়েছে, এই কলেজের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপার্সন পদে সগৌরবে বসে রয়েছেন সুরজিৎ নন্দী, যিনি খোদ বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পূর্ণসময়ের স্পোর্টস অফিসার। শুধু তাই নয়, ওই ইনস্টিটিউটের পরিচালন সমিতির সম্পাদক পদে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী পিয়ালী নন্দীও।
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিয়ম ও নির্দেশিকা স্পষ্ট বলছে:
- লাভজনক সংস্থায় নিষেধাজ্ঞা: বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কোনও পূর্ণসময়ের আধিকারিক, অধ্যাপক বা অশিক্ষক কর্মচারী কোনওভাবেই এই ধরণের কোনও ট্রাস্টি বোর্ড বা লাভজনক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন না।
- নিয়ম লঙ্ঘন: এই স্পষ্ট নিয়ম বহাল থাকা সত্ত্বেও ২০১৭ সাল থেকে কীভাবে সুরজিৎ নন্দী একই সঙ্গে দুটি লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলাচ্ছেন, তা নিয়ে বড়সড় আইনি ও প্রশাসনিক প্রশ্ন উঠে গিয়েছে।
অভিযুক্ত অফিসারের অদ্ভুত সাফাই ও তোলাবাজির অভিযোগ
এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে সুরজিৎ বাবুর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে প্রথমে তিনি ফোন কেটে দেন এবং ব্যক্তিগতভাবে দেখা করাও এড়িয়ে যান। পরবর্তীতে সন্ধ্যায় তিনি জানান যে এটি তাঁর বাবা মহাদেব নন্দীর নামে তৈরি ট্রাস্ট এবং এটি একটি অলাভজনক সংস্থা জেনেই তিনি কমিটিতে ছিলেন। তাঁর দাবি, “এভাবে যে কোনও ট্রাস্টে থাকা যায় না, আমি জানতাম না।”
৩২ বছর সরকারি চাকরি করার পরেও একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নূন্যতম নিয়ম জানেন না— এই অজুহাত নিয়ে এখন হাসাহাসি চলছে শিক্ষামহলে। অন্যদিকে, ওই কলেজেরই এক পড়ুয়া বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে জানিয়েছেন, “আমাদের এখানে যে কোনও ছুতোয় টাকা নেওয়া হয়।” ফলে এটি আদৌ কোনও অলাভজনক সংস্থা কি না, তা নিয়েও বড়সড় খটকা তৈরি হয়েছে।
কড়া পদক্ষেপের ইঙ্গিত উপাচার্যের
বিষয়টি সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য শঙ্করকুমার নাথ এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট ভাষায় কড়া পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। সোমবার তিনি বলেন, “এই বিষয়ে আগে আমার কিছু জানা ছিল না। তবে বিষয়টি যদি সত্যি প্রমাণিত হয়, তবে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে আইনানুগ কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই তদন্ত কমিটি গঠনের পর অভিযুক্ত স্পোর্টস অফিসারের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই তাকিয়ে সকলে।