মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে ইতিহাস, প্যানপাটিয়া জয় করে ফিরল ভারতীয় পর্বতারোহীরা!

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে ইতিহাস, প্যানপাটিয়া জয় করে ফিরল ভারতীয় পর্বতারোহীরা!

হিমালয়ের বুকে লুকিয়ে থাকা এক পৌরাণিক ও রহস্যময় পথ পুনরুজ্জীবিত করে নতুন নজির গড়ল ভারতীয় পর্বতারোহীদের দল ‘হিমালয়ান উইজার্ড’। প্রাচীন লোকগাথা অনুযায়ী, এই পথ দিয়েই এক সময়ে কেদারনাথে পুজো সেরে চোখের পলকে বদ্রীনাথে চলে যেতেন পুরোহিতরা। কালক্রমে সেই দুর্গম পথ হারিয়ে যায় গভীর হিমবাহের নিচে, যার পোশাকি নাম প্যানপাটিয়া কল। হিমালয়ের অন্যতম কঠিন ও বিপজ্জনক এই ট্রান্স-হিমালয়ান রুট জয় করতে গিয়ে চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েও শেষ পর্যন্ত সাফল্যের পতাকা ওড়ালেন অভিযাত্রীরা।

গত ৩ জুন বদ্রীনাথ থেকে ৫২৬০ মিটার উচ্চতার প্যানপাটিয়া পাস ছোঁয়ার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন সাত্যকি চট্টোপাধ্যায়, অভিষেক, কৌশিক সহ ১১ জনের এক অভিযাত্রী দল। সঙ্গে ছিলেন ৯ জন পোর্টার ও ৪ জন গাইড। ২০১১ সালে পর্বতারোহী তপন পণ্ডিতের এই পথ অতিক্রম করার দীর্ঘ দেড় দশক পর, আবারও সেই রুটেই ইতিহাস লিখল এই দল। তবে এই ঐতিহাসিক জয় সহজে আসেনি; বরং প্রকৃতির রোষে প্রতি পদে ছিল যমরাজের আস্তানা থেকে বেঁচে ফেরার এক ভয়াবহ লড়াই।

হাড়কাঁপানো ঠান্ডা আর তুষারঝড়ের কবলে অভিযাত্রীরা

অভিযানের মূল পরীক্ষা শুরু হয় দুর্গম চড়াই পার হওয়ার পর। আচমকাই আবহাওয়া এতটাই বিগড়ে যায় যে তীব্র দুর্যোগে তাঁবু খাটানোও আসাম্ভব হয়ে পড়ে। চৌখাম্বার ঠিক সামনে, খোলা আকাশের নিচে, স্লিপিং ব্যাগ ছাড়াই মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় স্রেফ বসে রাত কাটাতে বাধ্য হন অভিযাত্রীরা। এরপর পাসের ঠিক ৫০০ মিটার আগে শুরু হয় তীব্র তুষারঝড়, যেখানে দৃষ্টিসীমা নেমে আসে শূন্যে। ৫৪০০ মিটার উচ্চতায় প্রাণ হাতে নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ক্যাম্প করতে হয় দলকে।

খাদ্য ও জলের তীব্র সংকট

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এক সময়ে ফুরিয়ে আসতে শুরু করে রসদ। তীব্র প্রতিকূলতায় দিনের পর দিন খাবার জোটেনি দলের সদস্যদের। দৈনিক মাত্র ৮০০ মিলিলিটার জল দিয়ে তৃষ্ণা মেটাতে হতো, আর বাকি সময় বরফ চিবিয়েই বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে গেছেন অভিযাত্রীরা। এই চরম জলকষ্ট ও খাদ্যসংকটের মাঝেই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তারা।

অবশেষে সমস্ত বাধা চূর্ণ করে গত ৯ জুন সকাল সাড়ে ন’টায় প্যানপাটিয়ার শীর্ষে ভারতের পতাকা ওড়াতে সক্ষম হন তারা। রূপকথার সেই পুরোহিত-পথ জয় করে, ১০ জুন ভয়ঙ্কর কাচনি খাল পার হয়ে দলটি নিরাপদে নেমে আসে দ্বিতীয় কেদার মধ্যমহেশ্বরে। এই সফল অভিযান হিমালয়ের পর্বতারোহণের ইতিহাসে রোমাঞ্চ আর খাদের কিনার থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *