তৃণমূলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার চিঠি অরূপের, ঘাসফুল শিবিরে চরম আর্থিক গৃহযুদ্ধ!

বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর থেকেই চরম গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জর্জরিত তৃণমূল কংগ্রেস। এবার দলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং তার কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে এক নজিরবিহীন সংঘাত প্রকাশ্যে এল। দলের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ বা সাময়িকভাবে লেনদেন বন্ধ করার দাবি জানিয়ে এইচডিএফসি ব্যাংকের (HDFC Bank) একটি শাখায় চিঠি পাঠিয়েছেন তৃণমূলের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা হেভিওয়েট নেতা অরূপ বিশ্বাস। নিজেকে দলের ‘কোষাধ্যক্ষ’ দাবি করে পাঠানো ওই চিঠিতে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, দলের সিংহভাগ সাংসদ ও বিধায়কের বিদ্রোহের জেরে বর্তমানে দলীয় সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গভীর আইনি ও সাংগঠনিক বিরোধ তৈরি হয়েছে।
সাংসদ ও বিধায়কদের গণবিদ্রোহের প্রভাব
ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দেওয়া ওই চিঠিতে অরূপ বিশ্বাস দাবি করেন, তৃণমূলের ২৮ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ২০ জন এবং ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬৪ জন ইতিমধ্যেই হয় দল ছেড়েছেন অথবা প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। এই বিদ্রোহের জেরে দলের কর্তৃত্ব ও আর্থিক সম্পদ পরিচালনার অধিকার নিয়ে চরম বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। বিদ্রোহী নেতাদের হাতে থাকা বা তাঁদের সই করা দলীয় চেকগুলির অপব্যবহার হতে পারে—এমন জোরালো আশঙ্কা প্রকাশ করে অরূপ বিশ্বাস আবেদন জানান, দলের তহবিল সুরক্ষিত রাখতে ব্যাংকের তরফে যেন সমস্ত ধরণের ডেবিট লেনদেন এবং অ্যাকাউন্ট পরিচালনার বর্তমান নির্দেশিকা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়।
বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে কালীঘাট শিবির
তবে এই আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করে ময়দানে নেমেছে তৃণমূলের কালীঘাট শিবির। দলীয় সূত্রের খবর, অরূপ বিশ্বাস, যিনি দলের দীর্ঘদিনের দুর্গ হিসেবে পরিচিত টালিগঞ্জ বিধানসভা আসনে বিজেপির কাছে পরাজিত হয়েছেন, তাঁকে গত ৫ জুনই কোষাধ্যক্ষ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর জায়গায় স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে শুভাশিস চক্রবর্তীকে। অথচ ব্যাংকের কাছে পৌঁছানো ওই চিঠির প্রতিলিপি থেকে স্পষ্ট যে, পদ থেকে অপসারিত হওয়ার সাত দিন পর অর্থাৎ ১২ জুন এই চিঠি পাঠিয়েছেন অরূপ বিশ্বাস। ফলে এই চিঠির কোনো আইনি বৈধতা নেই এবং অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না বলে দাবি করছে তৃণমূল নেতৃত্ব।
ভরাডুবির জেরে বাড়ছে ভাঙন ও সংকট
গত এপ্রিল-মে মাসের বিধানসভা নির্বাচনে টানা ১৫ বছর অপরাজিত থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ২৯৪টি আসনের মধ্যে মাত্র ৮০টি আসনে থমকে যায়, যেখানে বিজেপি ২০০-র গণ্ডি পার করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। এই নজিরবিহীন ভরাডুবির পর থেকেই দলে মমতাকেন্দ্রিক একাধিপত্য এবং তাঁর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বিদ্রোহ শুরু করেন দলের জনপ্রতিনিধিরা।
দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে দুই-তৃতীয়াংশের গণ্ডি পার করে ২০ জন বিক্ষুব্ধ সাংসদ ইতিমধ্যেই ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’র সঙ্গে একীভূত হয়ে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি পাঠিয়েছেন এবং পরবর্তীতে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০০৯ সাল থেকে মমতার বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী তথা চার বারের সাংসদ শতাব্দী রায়ও এই বিদ্রোহকে সমর্থন জানিয়ে দাবি করেছেন, ‘দিদি’ আগের চেয়ে অনেক বদলে গিয়েছেন এবং সেই পরিবর্তনের কারণেই তিনি আজ বিজেপিকে সমর্থন করতে বাধ্য হচ্ছেন। সব মিলিয়ে, ক্ষমতা হারানোর পর এখন দলের অন্দরের এই চরম গৃহযুদ্ধ তৃণমূলকে আরও বড় সাংগঠনিক ও আর্থিক সংকটের মুখে ঠেলে দিল।