‘হাম দো হামারে দো’ অতীত, ভারতে কমছে প্রজনন হার ও ধেয়ে আসছে বার্ধক্যের ছায়া!

ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের চেনা ছবিটা এবার সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান এবং টেক দুনিয়ার শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ইলন মাস্কের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য সেই আশঙ্কার দিকেই ইঙ্গিত করছে। ভারতে জন্মহার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (TFR) এখন এতটাই নিম্নমুখী যে, তা জনসংখ্যার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বাভাবিক প্রতিস্থাপন স্তর বা ‘রিপ্লেসমেন্ট লেভেল’ (২.১)-এর নীচে নেমে গেছে। এর ফলে আগামী দিনে ভারতের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেন্সাস কমিশনারের (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক) কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (SRS) স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিপোর্ট’ অনুযায়ী, দেশে একজন মহিলার গড় সন্তান জন্মদানের হার এখন ২.১-এর কম। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রতি মহিলার গড়ে অন্তত ২.১ জন সন্তান হওয়া প্রয়োজন, যার কম হওয়া মানেই ভবিষ্যতে দেশের জনসংখ্যা কমতে শুরু করবে। গবেষকদের মতে, আগামী দুই দশকের মধ্যে ভারতের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর পর তা হু হু করে কমতে শুরু করবে এবং এই শতকের শেষে তা ১০০ কোটির আশেপাশে এসে ঠেকতে পারে।
আঞ্চলিক বৈষম্য এবং কলকাতার ‘লোয়েস্ট-লো’ ফার্টিলিটি ট্র্যাপ
এই জনমিতিক পরিবর্তন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইলন মাস্ক মন্তব্য করেছেন যে, ভারতের জন্মহার প্রতিস্থাপন স্তরের নীচে নেমে গেছে এবং উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে এই হার বহু বছর আগেই কমেছে। এই মন্তব্য ভারতের বর্তমান আঞ্চলিক চিত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। বিহারে প্রজনন হার ২.৯ হলেও, দেশের রাজধানী দিল্লিতে এই হার ১.২, যা ইউরোপের ফিনল্যান্ডের (১.৩) চেয়েও কম। পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতার চিত্রটিও দিল্লির চেয়ে আলাদা কিছু নয়। কলকাতার মতো শহরাঞ্চলে জন্মহার ইতিমধ্যেই দেশের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন (প্রায় ১.১ থেকে ১.২) স্তরে পৌঁছেছে, চিকিৎসকরা যাকে ‘লোয়েস্ট-লো’ ফার্টিলিটি বলছেন। কলকাতার এই প্রবণতা এখন ক্রমশ জেলাগুলিতেও ছড়িয়ে পড়ছে।
কারণ ও সামাজিক পরিবর্তনের মনস্তত্ত্ব
এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে মূলত কাজ করছে দ্রুত নগরায়ণ, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বদল। বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ একক পরিবারে বসবাস করেন। কর্মব্যস্ততা ও সন্তান লালন-পালনের চড়া খরচ বহন করা মধ্যবিত্তের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কেরিয়ারের দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে অনেকেই একটির বেশি সন্তান নিতে চাইছেন না, আবার অনেকেই ‘চাইল্ড-ফ্রি’ জীবন বেছে নিচ্ছেন। এ ছাড়া, বিগত দুই দশকে টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের প্রসারের ফলে গ্রামীণ এলাকাতেও ছোট পরিবারকে আধুনিক ও ‘আদর্শ’ পরিবার হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি হয়েছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
জন্মহার কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের কর্মক্ষম শ্রমশক্তিতে। সমাজে নতুন শিশুর আগমন কমে যাওয়ার অর্থ হলো ভবিষ্যতে যুবকের সংখ্যা হ্রাস পাবে এবং বয়স্ক মানুষের অনুপাত বৃদ্ধি পাবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে গড় আয়ু বাড়ায় ভবিষ্যতে নির্ভরশীল প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বিপুল হারে বাড়বে। এর ফলে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং পেনশন ব্যবস্থার ওপর চরম আর্থিক চাপ তৈরি হবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ একসময় জরুরি হলেও, তা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কমে গেলে আগামী দিনে কর্মক্ষম মানুষের অভাব এবং বার্ধক্যজনিত স্বাস্থ্য সঙ্কটের এক মারাত্মক সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।