গাছ কাটার দিন শেষ, এবার ছাদেই লাগান ‘সোলার ট্রি’! সামান্য জায়গায় মাসে বাঁচবে হাজার হাজার টাকার কারেন্ট বিল

দেখতে অবিকল সবুজ গাছের মতো হলেও এর কার্যক্ষমতা ঠিক একটি আধুনিক ছোট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো! এর নাম “সোলার ট্রি” (Solar Tree)। শহরের ছোট ফ্ল্যাট বা স্থানসংকটে থাকা ছাদের জন্য বিদ্যুৎ খরচ কমানোর এক যুগান্তকারী ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে এই বিশেষ প্রযুক্তির গাছ। সামান্য একটু জায়গা ব্যবহার করেই প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে এটি।
কীভাবে কাজ করে এই ‘বিদ্যুৎ গাছ’?
সোলার ট্রির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একটি মজবুত স্টিলের মূল খুঁটি। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরতে সক্ষম একাধিক ডালপালা, যেগুলোতে বসানো থাকে সোলার পিভি (PV) প্যানেল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সূর্যের গতিপথের সাথে প্যানেলগুলোও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘুরে যায়। ফলে সাধারণ ছাদের সোলার প্যানেলের চেয়ে এতে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। দিনে তৈরি হওয়া ডিসি (DC) কারেন্ট ব্যাটারিতে জমা থাকে এবং ইনভার্টারের মাধ্যমে এসি (AC) কারেন্টে রূপান্তরিত হয়ে সরাসরি গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত হয়।
সোলার ট্রির ৭টি মূল সুবিধা:
১. অবিশ্বাস্য জায়গা সাশ্রয়: ৪০০ বর্গফুটের সাধারণ সোলার প্যানেল যে পরিমাণ বিদ্যুৎ দেয়, সোলার ট্রি মাত্র ৪ বর্গফুট জায়গায় তার চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ঘনবসতিপূর্ণ শহরের জন্য এটি একদম আদর্শ। ২. ২৪ ঘণ্টা পাওয়ার ব্যাকআপ: উৎপাদিত বিদ্যুৎ লিথিয়াম ব্যাটারিতে জমা থাকায় রাতে, মেঘলা দিনে বা লোডশেডিংয়ের সময়ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। ৩. স্মার্ট অটো-ট্র্যাকিং ও সেলফ-ক্লিনিং: সূর্যকে অনুসরণ করার পাশাপাশি বৃষ্টির জল ব্যবহার করে প্যানেলগুলো নিজে থেকেই ধুলোবালি পরিষ্কার করে নেয়। ৪. মাল্টিফাংশনাল সুবিধা: এই গাছের নিচে বসার ব্যবস্থা, এলইডি স্ট্রিট লাইট, চারটি ইউএসবি চার্জিং পোর্ট, ওয়াইফাই হটস্পট এবং সিসিটিভি ক্যামেরাও যুক্ত করা যায়। ৫. পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘস্থায়ী: কোনো কার্বন নির্গমন ছাড়াই এটি একটানা ২৫ বছর পর্যন্ত পরিষেবা দেয়। বছরে মাত্র দু’বার সার্ভিসিং করালেই চলে। ৬. ঝড়-বৃষ্টি সহনশীল: গ্যালভানাইজড স্টিল দিয়ে তৈরি হওয়ায় এটি জং-রোধী এবং ঘণ্টায় ১০০ কিমি বেগের ঝড় অনায়াসে সহ্য করতে পারে। ৭. ৩০% সরকারি সাবসিডি: কেন্দ্রীয় সরকারের (MNRE) গ্রিন এনার্জি প্রকল্পের অধীনে এতে ৩০% পর্যন্ত ভর্তুকি পাওয়া যায়। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের সুলভ ঋণের সুবিধাও রয়েছে।
খরচ ও লাভ:
একটি ৫ কিলোওয়াট (5KW) সোলার ট্রির বর্তমান বাজারমূল্য সাধারণত ৫.৫ থেকে ৭ লক্ষ টাকা। তবে সরকারি ভর্তুকির পর এর প্রকৃত খরচ পড়ে প্রায় ৩.৮ থেকে ৪.৯ লক্ষ টাকা। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, পেট্রোল পাম্প, কারখানা বা আবাসনে এটি সহজেই বসানো সম্ভব। প্রতি মাসে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হলে মাত্র ৪-৫ বছরের মধ্যেই প্রাথমিক খরচ উঠে আসে এবং পরবর্তী ২০ বছর সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
ভারতে সোলার ট্রির বর্তমান চিত্র:
ভারতে দুর্গাপুরের CSIR-CMERI প্রথম এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেও বর্তমানে কলকাতার ইকো পার্ক, নিউটাউন, দিল্লির ইন্ডিয়া গেট এবং গুজরাটের বিভিন্ন স্মার্ট সিটিতে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতেও এর পাইলট প্রজেক্ট চলছে।
যাঁদের পর্যাপ্ত জমি বা বড় ছাদ নেই, কিন্তু সোলার শক্তি ব্যবহার করতে চান—তাদের জন্য “সোলার ট্রি” এক সেরা বিকল্প। আসল গাছ না কেটে, কৃত্রিম এই প্রযুক্তির গাছ লাগিয়ে বিদ্যুৎ বিল কমান এবং পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখুন।