‘কার কত সম্পত্তি?’ নজর রাখতে ‘গুপ্তচর’! পূর্ব বর্ধমানে বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে কোটি টাকার তোলাবাজির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ

পূর্ব বর্ধমান: কার কত টাকার সম্পত্তি? কোথায় আছে কত জমি, বাড়ি কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান? আর গত ১৫ বছরে তৃণমূলের কোন নেতা কত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন—তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য জোগাড় করতে নাকি বিশেষ ‘গুপ্তচর’ নিয়োগ করেছেন বিজেপির একাংশ! দুর্নীতির পর্দা উন্মোচন নয়, বরং সেই তথ্য ব্ল্যাকমেইল করে কোটি কোটি টাকা আদায় করাই এর মূল উদ্দেশ্য। পূর্ব বর্ধমানে উঠা এই চাঞ্চল্যকর ও গুরুতর অভিযোগে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে গেরুয়া শিবির।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রথমে প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা ও বিত্তশালী ব্যবসায়ীদের যাবতীয় আর্থিক সামর্থ্য ও সম্পত্তির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেই সমস্ত তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে জেলার কয়েকজন বিজেপি নেতার হাতে। এরপর শুরু হচ্ছে ফোন—সম্পত্তির সব হিসাব জানিয়ে ভয় দেখিয়ে সরাসরি দাবি করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। যার সম্পত্তি যত বেশি, তার তোলা দাবির অঙ্কও তত বড়। এমনও অভিযোগ উঠছে যে, তৃণমূল আমলে কে কত টাকা তোলা তুলেছিলেন, সেই হিসাবকে ভিত্তি করেই এখন পাল্টা টাকার মাপকাঠি ঠিক হচ্ছে।
সম্প্রতি জেলার এক ব্যবসায়ী সরাসরি অভিযোগ করেন, বিজেপির এক নেতা তাঁর কাছে ১ কোটি টাকা দাবি করেছেন। বিষয়টি জানিয়ে পুলিশে অভিযোগও জানান তিনি। একের পর এক এমন ঘটনার অভিযোগ সামনে আসায় বিজিপির অন্দরে শুরু হয়েছে চরম কোন্দল ও অস্বস্তি।
দলের পুরনো কর্মীদের একাংশের বক্তব্য, ক্ষমতায় আসার খুব কম সময়ের মধ্যেই এলাকায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিক ‘মধুভাণ্ড’ ও জমির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—তা নিয়েই বিজেপির গোষ্ঠীকোন্দল চরম আকার নিয়েছে। সম্প্রতি মন্তেশ্বরে বিজেপি বিধায়ক সৈকত পাঁজার বিরুদ্ধে দলীয় কর্মীদের বিক্ষোভ, বর্ধমানের শ্যামলালে দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষ এবং জামালপুর ও কালনায় বারবার অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে আসার ঘটনায় দলের অনুশাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তৃণমূল নেতা দেবু টুডু বিজেপিকে নিশানা করে বলেন, “আমাদের বহু কর্মী এখনও ঘরছাড়া। জমি থেকে চাষ তুলে দেওয়া হচ্ছে, অন্যায় জরিমানা চাওয়া হচ্ছে। সাধারণ অসহায় মানুষ এখন কোথায় যাবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।”
অন্যদিকে, তোলাবাজির এসব অভিযোগের বিষয়ে মুখ খুলেছেন গলসির বিজেপি বিধায়ক রাজু পাত্র। তিনি সাফ জানান, “অন্যায়ের বিরুদ্ধে দল বিন্দুমাত্র রেয়াত করবে না। শীর্ষ নেতৃত্বের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, যাঁরা এ ধরনের অপকর্ম বা তোলাবাজির সঙ্গে যুক্ত, সংশোধন না হলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” বিজেপি সূত্রে খবর, বেশ কয়েকজনকে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দল থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও জেলে পাঠানোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছে জেলা বিজেপি নেতৃত্ব।
তবে ব্যক্তিগত গুপ্তচর লাগিয়ে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করার ঘটনা কেবল দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, বরং এটি একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এখন দেখার, পুলিশ-প্রশাসন এই অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেয় এবং বিজেপি নেতৃত্ব নিজেদের কথা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে কি না।