১৫ অগাস্ট নয়, লালকেল্লায় প্রথম পতাকা উত্তোলন হয় ১৬ অগাস্ট! জানুন স্বাধীনতা দিবসের ১০ রহস্য

১৫ অগাস্ট এলে ভারতের লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ঐতিহাসিক জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ছবি ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের কথাই সবার মনে পড়ে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, পাঠ্যবইয়ের বাইরেও এই দিনটিকে ঘিরে রয়েছে বহু চমকপ্রদ ও অজানা সত্য।
১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ঘিরে থাকা এমনই ১০টি বিস্ময়কর ঐতিহাসিক রহস্য:
১. স্বাধীনতা দেওয়ার কথা ছিল ১৯৪৮ সালে
মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারত ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট স্বাধীন হওয়ার কথা ছিল না। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৮ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু দেশজুড়ে দ্রুত রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় লর্ড মাউন্টব্যাটেন নির্ধারিত তারিখ বেশ কিছুটা এগিয়ে আনেন।
২. ১৫ অগাস্ট বেছে নেওয়ার পেছনে ‘জাপান লিংক’!
লর্ড মাউন্টব্যাটেন ব্যক্তিগতভাবে ১৫ অগাস্ট তারিখটি নির্বাচন করেন। ১৯৪৫ সালের এই দিনেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল জাপান। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিত্রবাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে এই স্মৃতি ও দিনটি মাউন্টব্যাটেনের কাছে অত্যন্ত আবেগঘন ছিল।
৩. লালকেল্লায় প্রথম তেরঙ্গা উত্তোলিত হয় ১৬ অগাস্ট!
সবচেয়ে বড় প্রচলিত ভুল ধারণার অবসান ঘটে এই তথ্যে। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (PIB) ও নেহরু আর্কাইভের নথি অনুসারে, জওহরলাল নেহরু লালকেল্লায় প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন ১৯৪৭ সালের ১৬ অগাস্ট, ১৫ অগাস্ট নয়! তাঁর ঐতিহাসিক বক্তৃতা ‘The Honour of the Flag’-ও ১৬ অগাস্টে নথিবদ্ধ করা হয়।
৪. সূর্যোদয়ের আগেই চেন্নাইয়ে প্রথম তেরঙ্গা
চেন্নাইয়ের (তৎকালীন মাদ্রাজ) ফোর্ট সেন্ট জর্জ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রেশমের ১২×৮ ফুটের বিশাল তেরঙ্গাটি ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট ভোর ৫:৩০ মিনিটে উত্তোলিত হয়েছিল, যা দেশের অন্যতম প্রথম উত্তোলিত জাতীয় পতাকা।
৫. উদযাপনের দিনে অনশনে মহাত্মা গান্ধী
দেশজুড়ে যখন স্বাধীনতার উদযাপনের আনন্দ-উল্লাস, তখন জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী দিল্লিতে কোনো উৎসবে যোগ দেননি। তৎকালীন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রোধ ও সম্প্রীতির বার্তা দিতে তিনি কলকাতায় অবস্থান করছিলেন এবং সারাদিন উপবাস ও প্রার্থনায় ব্রতী ছিলেন।
৬. ১৫ অগাস্টে ভারত কিন্তু ‘প্রজাতন্ত্র’ হয়নি
১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট ভারত স্বাধীনতা পেলেও সাথে সাথেই ‘প্রজাতন্ত্র’ (Republic) হয়ে ওঠেনি। ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট ১৯৪৭’ অনুযায়ী ভারত ও পাকিস্তান ছিল দুটি স্বাধীন ‘ডোমিনিয়ন’। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের নিজস্ব সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরেই ভারত পূর্ণাঙ্গ গণপ্রজাতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
৭. স্বাধীনতার মাত্র ২৪ দিন আগে তেরঙ্গা গৃহীত হয়
ভারতের বর্তমান রূপের জাতীয় পতাকাটি গণপরিষদ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই—স্বাধীনতার ঠিক ২৪ দিন আগে। তার আগে চরকা সংবলিত পতাকা ব্যবহার করা হতো।
৮. ২৬ জানুয়ারিই ছিল মূল ‘পূর্ণ স্বরাজ’ দিবস
১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রথম ‘পূর্ণ স্বরাজ’ দিবস উদযাপন করেছিল। সেই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি সংবিধান কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা আজ আমাদের ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’।
৯. ১৯৪৭-এর ১৫ অগাস্টে জাতীয় সংগীত ছিল না ‘জন গণ মন’
১৯৪৭ সালের অগাস্টে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত ‘জন গণ মন’ গানটি ভারতের অফিসিয়াল জাতীয় সংগীত ছিল না। বহু পর্যালোচনার পর ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদ এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করে।
১০. ভারত ও পাকিস্তান—উভয়েরই আইনি স্বাধীনতা দিবস ১৫ অগাস্ট!
১৯৪৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইন অনুযায়ী ১৫ অগাস্টকেই দুই দেশের জন্য ‘নির্ধারিত দিন’ (Appointed Day) বলা হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন সময়সূচি ও প্রশাসনিক সুবিধার কারণে পাকিস্তান ১৪ অগাস্ট তাদের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন শুরু করে।
উপসংহার: ইতিহাসের এই অজানা পাতাগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, ১৫ অগাস্ট কেবল ক্যালেন্ডারের একটি বিশেষ দিন নয়; এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে রক্তক্ষয়ী দেশভাগ, অগণিত ত্যাগ ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম নেওয়ার রোমাঞ্চকর ইতিহাস।