পিছনে বন্ধ দরজা, সামনে আগুনের শিখা: শ্রাবণের শেষ সোমবারে তারাপীঠে পুজো দিতে এসে প্রাণ হারালেন ৭ পুণ্যার্থী

তারাপীঠ: শ্রাবণের শেষ সোমবারে তারাপীঠের মন্দিরে মায়ের পুজো দিয়ে পুণ্য অর্জনের আশায় এসেছিলেন শতাধিক ভক্ত। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার আগেই সেই ভক্তি আর আনন্দের পরিবেশ রূপ নিল এক বিভীষিকাময় ট্র্যাজেডিতে। মন্দির সংলগ্ন একটি হোটেলে আচমকা লেগে যাওয়া আগুনে ঝলসে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৭ জন পুণ্যার্থীর। যাঁরা ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেছেন, তাঁদের মুখে উঠে এসেছে এক হাড়হিম করা অভিজ্ঞতার কথা।
ভোররাত্রে বিকট শব্দ ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী: স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। হোটেলের বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রধান MCB (মেনিএচার সার্কিট ব্রেকার) বিকট শব্দে ফেটে যায়। সেখান থেকেই মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে রিসেপশন ও সংলগ্ন ঘরগুলিতে। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গোটা হোটেল নিমিষে ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। সেই সময় অধিকাংশ আবাসিক গভীর ঘুমে মগ্ন ছিলেন। বিকট শব্দে ঘুম ভাঙতেই তীব্র আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়।
পিছনে বন্ধ দরজা, সামনে আগুনের গ্রাস: হোটেলটিতে বেরোনোর একটি পিছনের রাস্তা থাকলেও বাইরে থেকে আসা পুণ্যার্থীদের অনেকেই তা জানতেন না। আতঙ্কের চোটে যাঁরা পিছনের দরজার দিকে যান, তাঁরা দেখেন দরজাটি তালাবন্ধ। ফলে বাধ্য হয়ে সামনের দিকে আসতে গিয়ে অনেকেই আগুনের লেলিহান শিখা ও বিষাক্ত ধোঁয়ার কবলে পড়েন। প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই হোটেলের বারান্দার পাইপ বেয়ে নিচে নেমে আসেন।
হোটেল মালিক তপনজ্যোতি মণ্ডল নিজেও পরিবার ও ৭২ বছরের বৃদ্ধা মাকে নিয়ে ওই হোটেলেই ছিলেন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “রিসেপশনের ঠিক পিছনের রুমেই মা ছিলেন, পাশের ঘরে স্ত্রী ও দুই বাচ্চা। দরজা খুলতেই দেখি চারদিকে আগুন ও ধোঁয়া। এসি থাকার কারণে ঘরে কোনো ভেন্টিলেশন ছিল না। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বাধ্য হয়ে বাথরুমে জল চালিয়ে সাহায্য চেয়ে চিৎকার শুরু করি।”
উদ্ধারকাজ ও প্রশাসনের ভূমিকা: খবর পাওয়ার পর তারাপীঠ ও রামপুরহাট থানার পুলিশ এবং দমকল বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই শুরু হয় জোরকদমে উদ্ধারকাজ। অচৈতন্য অবস্থায় ৯ জনকে ঘর থেকে বের করা হয়।
বীরভূমের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নীলেশ শ্রীকান্ত গায়কোয়াড় জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় আহত ১৩-১৪ জনকে তড়িঘড়ি রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
তদন্তে পুলিশ ও দমকল: প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, শর্ট সার্কিট এবং হোটেলের ভেতরের ফাইবারের ডেকোরেশনের কারণেই আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। হোটেলে উপযুক্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না, নাকি এটি নিছকই গাফিলতির ফল—তা খতিয়ে দেখতে বিস্তৃত তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ও দমকল বিভাগ।