হিজাব না পরলে ধর্ম বিপন্ন হয় না! স্কুলে স্কার্ফ পরার আর্জি খারিজ করে ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ এলাহাবাদ হাইকোর্টের

হিজাব না পরলে ধর্ম বিপন্ন হয় না! স্কুলে স্কার্ফ পরার আর্জি খারিজ করে ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ এলাহাবাদ হাইকোর্টের

স্কুলের নির্ধারিত পোশাকবিধি (ড্রেস কোড)-র ওপর কোনো ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত পছন্দ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না— একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় এমনই সাফ জানিয়ে দিল এলাহাবাদ হাইকোর্ট। স্কুলে ইউনিফর্মের পাশাপাশি মাথায় স্কার্ফ বা হিজাব পরার অনুমতি চেয়ে এক মুসলিম ছাত্রীর করা আবেদন খারিজ করে দিয়েছে আদালত।

বিচারপতি জে. জে. মুনির এবং বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ শুক্লার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায় দিয়ে জানান, আবেদনকারী ছাত্রী এটি প্রমাণ করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছেন যে— মাথা ঢেকে রাখা ইসলামের এমন এক অপরিহার্য অঙ্গ, যা না মানলে ধর্মীয় বিশ্বাস বিপন্ন হবে।

ঘটনাটি ঠিক কী?

প্রয়াগরাজের ‘টেগোর পাবলিক স্কুল’-এর একাদশ শ্রেণির ছাত্রী সুকাইনা রিজভি তাঁর মায়ের মাধ্যমে হাইকোর্টে একটি আবেদন জানান। তাঁর দাবি ছিল, তিনি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অন্য একটি স্কুলে মাথায় স্কার্ফ পরেই পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার সময় নতুন স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁকে স্কার্ফ পরে আসার অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। ছাত্রীর পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, মাথায় স্কার্ফ পরা তাঁর ধর্মীয় স্বাধীনতার অংশ এবং এতে বাধা দিলে সংবিধানের ১৪ এবং ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদে দেওয়া মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়।

অন্যদিকে, স্কুল কর্তৃপক্ষ আদালতে স্পষ্ট জানায় যে— ড্রেস কোড সব ধর্ম ও জাতির শিক্ষার্থীদের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো একজন শিক্ষার্থীকে বিশেষ ছাড় দেওয়া হলে তা স্কুলের মূল শৃঙ্খলা ও অভিন্নতার নীতিকে ব্যাহত করবে। এমনকি একই সম্প্রদায়ের অন্যান্য ছাত্রীরাও কোনো আপত্তি ছাড়াই নির্ধারিত পোশাক পরে স্কুলে আসছে।

আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণসমূহ:

১. অতীতে শিথিলতা মানেই স্থায়ী ছাড় নয়: ছাত্রীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আগে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁকে স্কার্ফ পরতে বাধা দেয়নি। এর জবাবে বিচারপতিরা বলেন— অতীতে কোনো কারণে স্কুল কর্তৃপক্ষ কোনো নিয়ম শিথিল বা উপেক্ষা করে থাকলেও, পরবর্তীতে তারা নিজেদের ইউনিফর্ম নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে পারবে না, এমন কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা (Estoppel) তৈরি হতে পারে না।

২. ইউনিফর্মের মূল উদ্দেশ্য: আদালতের মতে, স্কুলের পোশাক কেবল একটি পরিধান নয়; এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমতা তৈরি করে, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় গড়ে তোলে এবং ধর্ম-নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে। ব্যক্তিগত ইচ্ছামতো পোশাকে ছাড় দিতে থাকলে স্কুলের শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষমতা আদালতের হাতে না থেকে শিক্ষার্থীদের হাতে চলে যাবে।

৩. ইসলামে হিজাব অপরিহার্য নয়: বিচারপতিরা বোম্বে, কেরল এবং বিশেষ করে কর্ণাটক হাইকোর্টের ২০২২ সালের ফুল বেঞ্চের রায় উল্লেখ করে জানান— এ যাবৎ বিভিন্ন হাইকোর্ট সর্বসম্মতভাবে এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছেছে যে, হিজাব ইসলাম ধর্মের কোনো ‘অপরিহার্য অংশ’ (Essential Religious Practice) নয়। কর্ণাটক হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়কে একটি গ্রহণযোগ্য নজির হিসেবে গণ্য করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট এই আর্জি পুরোপুরি খারিজ করে দেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *