হাজার হাজার গবাদি পশুর প্রাণ বাঁচায় বিহারের ‘ঘাস ট্রেন’, বন্যাকবলিত এলাকার এক জীবন্ত জীবনরেখা

বর্ষা এলেই বিহারের খাগাড়িয়া, সহরসা, নওগছিয়া সহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। বাড়িঘর, মাঠঘাট ও চাষের জমি জলের তলায় চলে যাওয়ায় স্থানীয় পশুপালকদের সামনে দেখা দেয় তীব্র খাদ্যসংকট। নিজের এলাকায় শুকনো চারা বা ঘাসের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। আর এই চরম বিপদের সময়েই স্থানীয় পশুপালকদের একমাত্র আশ্রয় হয়ে ওঠে একটি সাধারণ লোকাল ট্রেন—‘সমস্তিপুর-সাহারসা প্যাসেঞ্জার’।
রেলের খাতায় ট্রেনটির নাম সমস্তিপুর-সাহারসা প্যাসেঞ্জার হলেও, খাগড়িয়া, মানসি, বদলা ঘাট, ধামারা ঘাট ও কোপাড়িয়ার মতো কোশি অঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছে এটি জনপ্রিয় ‘ঘাস ট্রেন’ বা ‘চারা এক্সপ্রেস’ নামে। বন্যার দিনে প্রতিদিন সকালে এই ট্রেনে চেপে স্থানীয় বাসিন্দারা চলে যান বহু দূরের শুকনো এলাকায়। সারাদিন মাঠ ঘুরে গবাদি পশুর জন্য ঘাস কেটে বড় বড় বোঝা বাঁধেন। এরপর বিকেল বা সন্ধ্যার ট্রেনে সেই ঘাসের বোঝা চাপিয়ে ফেরেন নিজের গ্রামে।
মানুষের যাতায়াতের পাশাপাশি এই ট্রেনটি কার্যত বোবা পশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই বর্ষার মরসুমে এই চেনা ছবি ধরা পড়ে এসেছে। তবে এই দূরপাল্লার সফরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি। অতিরিক্ত ভিড় এবং ট্রেনের জানলা-দরজার বাইরে ঘাসের বিশাল বোঝা ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়ার ফলে প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালে খাগাড়িয়ার মানসি ও জংশনের মাঝে একটি ঘাসের বোঝা ওভারহেড বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ধাক্কা খেলে তার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কিছু সময়ের জন্য ট্রেন চলাচল স্তব্ধ হয়ে যায়।
রেল কর্তৃপক্ষের কড়াকড়ি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই প্রতিদিন এই বিপজ্জনক যাত্রা করেন। কারণ, বন্যার মধ্যে ঘরের গবাদি পশুগুলোকে না খাইয়ে মারার চেয়ে এই ঝুঁকি নেওয়াটাই তাঁদের কাছে একমাত্র পথ।
আজকের যুগে ঝকঝকে বন্দে ভারত বা রাজধানী এক্সপ্রেসের দাপট সর্বত্র। কিন্তু বিহারের দূরন্ত কোশি অঞ্চলে সমস্তিপুর-সাহারসা প্যাসেঞ্জার প্রমাণ করে যে, ট্রেন কেবল যাত্রী পরিবহণের মাধ্যম নয়—তা জীবনসংগ্রামের এক অনন্য জীবনরেখা।